নীরবেই অবসরে চলে গেলেন গুণী শিক্ষক মুজিবুর রহমান
কামরুল হাসান।। ৩২ বছরের দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের অবসান ঘটিয়ে অবসরে গেলেন সাতক্ষীরার কলারোয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গুণী শিক্ষক মুজিবুর রহমান। সোমবার (৩১ আগস্ট) ছিল তাঁর চাকরিজীবনের শেষ দিন। অথচ দীর্ঘ এই কর্মজীবনে অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবনের ভিত গড়ে দেওয়া এই আদর্শ শিক্ষক বিদায় নিলেন একেবারেই নীরবে, নিভৃতে—প্রাপ্য বিদায় সংবর্ধনাটুকুও পেলেন না তিনি। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় বিভিন্ন মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। তবে বিদ্যালয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ফুলেল শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি নানা উপহারসামগ্রী তুলে দেন তাঁর হাতে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মাসুদুর রহমান জানান, স্কুলের পক্ষ থেকে তাকে বিশাল আয়োজনের সংবর্ধনা দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রধান শিক্ষক মুজিবুর রহমানের প্রবল আপত্তির মুখে সেই অনুষ্ঠান করা যায়নি। তবে তাঁকে ফুল ও উপহার দিয়ে বিদায় জানানোর পাশাপাশি একটি ফুল দিয়ে সাজানো সাদা রঙের ট্যাক্সিতে করে তাঁকে স্কুল থেকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে সম্মান জানানো হয়।
জানা যায়, ১৯৯৪ সালের ৬ ডিসেম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর বর্ণাঢ্য শিক্ষকতা জীবনের সূচনা।
গণিত বিষয়ের প্রথিতযশা শিক্ষক হিসেবে তাঁর সুখ্যাতি ছিল সর্বত্র। কঠিন গণিতকে সহজ ও আকর্ষণীয়ভাবে শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করার অসাধারণ দক্ষতা ছিল তাঁর। তাঁর পাঠদান শিক্ষার্থীদের ভীষণভাবে আকৃষ্ট করত। শিশুদের প্রতি ছিল তাঁর গভীর ভালোবাসা ও মমত্ববোধ। ফলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীক।
অত্যন্ত বিনয়ী, সদালাপী, নির্মোহ ও গুণী মানুষ হিসেবে কর্মজীবনে সবার শ্রদ্ধা অর্জন করেন তিনি। একজন আদর্শ শিক্ষকের যেসব গুণ থাকা প্রয়োজন, তার প্রায় সবই ছিল তাঁর মধ্যে। তাঁর অসাধারণ কর্মদক্ষতা ও নিষ্ঠার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হন।
কলারোয়া পৌরসভার মুরারিকাটি গ্রামের সন্তান এই শিক্ষক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি একজন জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর। তাঁর তৈরি করা শিক্ষামূলক রিলস-ভিডিও মানুষের প্রশংসা পেয়ে এসেছে। কর্মজীবনে তিনি হেলাতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ২৮ জানুয়ারি কলারোয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। যোগদানের পর থেকে বিদায়ের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি কলারোয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। তাঁর কর্মদক্ষতা, নেতৃত্ব ও শিক্ষাদানের অনন্য কৌশলে বিদ্যালয়টি জেলার শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি লাভ করে। তাঁর কর্মজীবনের সাফল্যের পেছনে ছিল দায়িত্ববোধ, শিক্ষার্থীদের প্রতি মমত্ববোধ এবং শিক্ষা পেশার প্রতি গভীর ভালোবাসা। বিদায়ী প্রধান শিক্ষক মুজিবুর রহমান বলেন, ব্যক্তিগতভাবে আমি কোনো বিদায় অনুষ্ঠান হোক, এটা চাইনি। হয়তো বিদায় অনুষ্ঠান আমাকে আরও বেশি আবেগাক্রান্ত করে তুলতো। এই বিদ্যালয়টি আমার জীবনের স্বপ্ন, ভালবাসা। আমি হয়তো আর কখনোই বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গনে আসবো না। দূর থেকে ভালবেসে যাবো আজীবন। প্রধান শিক্ষকের এই আবেগময় বক্তব্যের আড়ালে কী সত্য লুকিয়ে আছে তা জানা যায়নি। প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নেতা প্রধান শিক্ষক নুরুল্লাহ বলেন, আমরা শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে তাকে বিদায় সংবর্ধনা দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু উনার আগ্রহ না থাকায় তা করা যায়নি। এ বিষয়ে আলাপকালে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মাসুদুর রহমান জানান, শিক্ষক সমিতি এই গুণী শিক্ষকের বিদায় সম্বর্ধনা দিতে না পারলেও আমি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের পক্ষ থেকে তাঁর সংর্ধনা অনুষ্ঠানের একটি আয়োজন করেছি। যার দিনক্ষণ এখনো ঠিক করা হয়নি। তিনি বলেন, প্রধান শিক্ষক মুজিবুর রহমানের মতো গুণী শিক্ষককে অবশ্যই তাঁর প্রাপ্য সম্মাননা ও সংবর্ধনা দেওয়া উচিত।
সম্পর্কিত সংবাদ
কলারোয়ায় নজরুল বর্ষের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার উদ্বোধন
কামরুল হাসান।। কলারোয়ায় নজরুল বর্ষ-২০২৬ উপলক্ষে উপজেলা পর্যায়ের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করা হয়েছে। সোমবার সকালবিস্তারিত…
কলারোয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালতে মাদক ব্যবসায়ীর কারাদণ্ডসহ জরিমানা
কামরুল হাসান।। কলারোয়ায় গাঁজাসহ আলিম গাজী (৫০) নামে এক মাদক ব্যবসায়ীকে ৬মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডসহ দুইবিস্তারিত…


