ঈদে মিলাদুন্নবীঃ ভালোবাসা, সুন্নাহ ও মানবতার শিক্ষা- মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম সাদিক

ইসলাম শান্তি, সাম্য, মানবতা ও উত্তম চরিত্রের ধর্ম। মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় হাবিব হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, “আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।” (সুরা আল-আম্বিয়া: ১০৭)। তাই রাসুল (সা.)-এর আগমন মুসলিম উম্মাহর জন্য নিঃসন্দেহে এক মহিমান্বিত নিয়ামত। ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে তাঁর জীবন, আদর্শ ও শিক্ষা স্মরণ করার তাৎপর্য এখানেই।

রাসুল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।” (সুরা আল-আহজাব: ২১)। অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু একটি নির্দিষ্ট সময় বা জাতির জন্য আদর্শ নন; তাঁর চরিত্র, ন্যায়বিচার, ক্ষমাশীলতা, দয়া, সততা ও মানবিকতা সব যুগের মানুষের জন্য অনুসরণীয়।

রাসুল (সা.)-এর চরিত্রের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, “নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।” (সুরা আল-কলম: ৪)। তাঁর জীবনের দিকে তাকালে আমরা দেখি—তিনি শত্রুকেও ক্ষমা করেছেন, এতিম-দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করেছেন এবং দুর্বলদের প্রতি সহমর্মিতা দেখিয়েছেন। মক্কা বিজয়ের দিন প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সাধারণ ক্ষমার যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছিলেন, তা মানব ইতিহাসে অনন্য।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মদিন স্মরণ করার সঙ্গে তাঁর সুন্নাহ অনুসরণের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে, তাঁকে সোমবার রোজা রাখার কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, “এ দিনেই আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এ দিনেই আমার ওপর ওহি নাজিল হয়েছে।” (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)। এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, নিজের জন্মের দিনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি আমল তিনি রোজার মাধ্যমে করেছেন।

তবে ঈদে মিলাদুন্নবী পালন নিয়ে মুসলিম সমাজে বিভিন্ন মত রয়েছে। এ বিষয়ে মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে বিভেদ, বিদ্বেষ বা পরস্পরকে হেয় করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। যারা এ উপলক্ষে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন আলোচনা করেন, দরুদ পাঠ করেন, দান-সদকা করেন এবং তাঁর আদর্শ অনুসরণের অঙ্গীকার করেন, তাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—এসব কাজ যেন শরিয়তসম্মত হয় এবং কোনো হারাম, অপচয় বা অনৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত না হয়।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরুদ পাঠান। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠাও।” (সুরা আল-আহজাব: ৫৬)। তাই রাসুল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার অন্যতম প্রকাশ হলো বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা এবং তাঁর সুন্নাহ নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা।

আজকের সমাজে যখন হিংসা, সহিংসতা, অন্যায়, দুর্নীতি ও পারস্পরিক বিদ্বেষ বাড়ছে, তখন ঈদে মিলাদুন্নবীর শিক্ষা আমাদের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। শুধু আলোচনা, সভা বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে রাসুল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁর সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ন্যায়বিচার, ক্ষমা, দয়া ও মানবসেবার আদর্শকে জীবনের অংশ করতে হবে।

রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে-ই, যার চরিত্র সর্বোত্তম।” (সহিহ বুখারি)। সুতরাং ঈদে মিলাদুন্নবীর প্রকৃত শিক্ষা হলো—রাসুল (সা.)-কে ভালোবাসা, তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠ করা, তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করা এবং তাঁর দেখানো মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় নিজেকে নিয়োজিত করা।

রাসুল (সা.)-এর জন্ম আমাদের জন্য শুধু আনন্দের স্মৃতি নয়; বরং এটি অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরে আসার আহ্বান। তাঁর আদর্শ অনুসরণেই ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। তাই আসুন, ঈদে মিলাদুন্নবীর এই মাহাত্ম্যকে হৃদয়ে ধারণ করে আমরা প্রতিজ্ঞা করি—রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ভালোবাসা শুধু মুখের কথায় নয়, আমাদের চরিত্র ও কর্মের মধ্যেও প্রতিফলিত হবে।

লেখকঃ প্রাবন্ধিক ও মুদ্রণ ব্যবস্থাপক
দৈনিক সিলেটের ডাক






সম্পর্কিত সংবাদ

  • মান্দারবাড়িয়া: কক্সবাজারের বিকল্প নয়, বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক বিস্ময়
  • সমুদ্র পর্যটনে নতুন সম্ভাবনা সুন্দরবনের সৈকত
  • সাতক্ষীরা নিউজ এর পক্ষ থেকে দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা
  •  কলারোয়া গ্রামঞ্চল থেকে বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী ধানের গোলা
  • ডেলিভারি সম্পর্কে ধারনা পাল্টে দিল আদ্-দ্বীন হাসপাতাল
  • দেশের স্বার্থে বিএনপি-জামায়াত ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা
  • অনলাইন সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা: প্রেক্ষিত সাতক্ষীরা