মান্দারবাড়িয়া: কক্সবাজারের বিকল্প নয়, বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক বিস্ময়
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পর্যটন সম্পদ কোনটি? অধিকাংশ মানুষ এক বাক্যে বলবেন কক্সবাজার। কিন্তু প্রশ্নটি যদি একটু ভিন্নভাবে করা হয় তাহলে উত্তরও ভিন্ন হবে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অনাবিষ্কৃত পর্যটন সম্পদ কোনটি? এই প্রশ্নের উত্তর হতে পারে সাতক্ষীরার মান্দারবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত।
আমরা এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যখন বিশ্বের পর্যটন শিল্পের সংজ্ঞাই বদলে যাচ্ছে। পর্যটকরা আর শুধু সমুদ্র দেখতে চান না। তারা এমন একটি অভিজ্ঞতা খোঁজেন, যেখানে প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, স্থানীয় সংস্কৃতি, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং অ্যাডভেঞ্চার একসঙ্গে মিলিত হয়। এই পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় মান্দারবাড়িয়া বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ইকো ট্যুরিজম ব্র্যান্ড হওয়ার সব উপাদান ধারণ করে আছে।
সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে, বঙ্গোপসাগরের তীরে প্রায় আট কিলোমিটার দীর্ঘ এই নির্জন বেলাভূমি আজও অবহেলায় পড়ে আছে। এক পাশে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, অন্য পাশে অসীম সমুদ্র। মাঝখানে লাল কাঁকড়ার বিচরণ, পাখির কলতান, নদী, বন এবং বন্যপ্রাণীর সহাবস্থান এমন একটি প্রাকৃতিক অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করেছে, যা বাংলাদেশের অন্য কোনো সমুদ্র সৈকতে নেই। অথচ যোগাযোগ ব্যবস্থা, অবকাঠামো এবং পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের অভাবে এই সম্পদ এখনো জাতীয় পর্যটনের মূলধারায় আসতে পারেনি। এখানেই আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল। আমরা মান্দারবাড়িয়াকে একটি সৈকত হিসেবে দেখি, কিন্তু বিশ্বের উন্নত দেশগুলো এমন জায়গাকে দেখে অর্থনীতির ইঞ্জিন হিসেবে।সিঙ্গাপুরের কোনো পাহাড় নেই, মালদ্বীপের কোনো বন নেই, দুবাইয়ের কোনো প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত ছিল না। তবুও তারা পরিকল্পনা, ব্র্যান্ডিং এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে বিশ্ব পর্যটনের শীর্ষ গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রকৃতি সেই সম্পদ বিনা মূল্যে দিয়েছে। প্রয়োজন শুধু দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং সঠিক পরিকল্পনা।
মান্দারবাড়িয়াকে কেন্দ্র করে সরকার চাইলে আগামী বিশ বছরে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে একটি বাংলাদেশ ম্যানগ্রোভ কোস্টাল ইকোনমিক জোন গড়ে তুলতে পারে। যেখানে পর্যটন হবে অর্থনীতির কেন্দ্র, আর পরিবেশ সংরক্ষণ হবে উন্নয়নের শর্ত। এখানে কোনো কংক্রিটের নগর নয়, বরং পরিবেশবান্ধব ইকো লজ, সৌরশক্তিচালিত নৌযান, কাঠের বোর্ডওয়াক, স্থানীয় জনগোষ্ঠী পরিচালিত হোমস্টে এবং সীমিত ধারণক্ষমতার পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে প্রকৃতিও রক্ষা পাবে, আবার স্থানীয় মানুষের আয়ও বাড়বে।
আরও একটি সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। বাংলাদেশ যদি সত্যিই ব্লু ইকোনমিকে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি করতে চায়, তাহলে মান্দারবাড়িয়াকে দেশের প্রথম ব্লু কার্বন ট্যুরিজম জোন হিসেবে ঘোষণা করা যেতে পারে। ম্যানগ্রোভ বন পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ কার্বন শোষণকারী প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। এই সম্পদ সংরক্ষণকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করে আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল, কার্বন ক্রেডিট এবং পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
মান্দারবাড়িয়ার জন্য আমার আরেকটি প্রস্তাব হলো বাংলাদেশ ম্যানগ্রোভ রিসার্চ অ্যান্ড ট্যুরিজম ইনোভেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠা। এখানে পরিবেশ বিজ্ঞানী, পর্যটন বিশেষজ্ঞ, জলবায়ু গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করবে। এতে মান্দারবাড়িয়া শুধু ভ্রমণের স্থান নয়, জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিরও অংশ হয়ে উঠবে।
বিশ্বের বহু দেশ তাদের উপকূলকে উৎসবের মাধ্যমে ব্র্যান্ড করেছে। মান্দারবাড়িয়ায় প্রতিবছর আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ উৎসব, লাল কাঁকড়া উৎসব, উপকূলীয় আলোকচিত্র উৎসব, সামুদ্রিক সাহিত্য সম্মেলন এবং ইকো ম্যারাথন আয়োজন করা যেতে পারে। এতে সারা বিশ্বের প্রকৃতিপ্রেমী, গবেষক এবং গণমাধ্যমের দৃষ্টি সাতক্ষীরার দিকে আকৃষ্ট হবে।
পর্যটনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি একই সঙ্গে শতাধিক খাতকে সচল করে। একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠলে শুধু হোটেল নয়, কৃষি, মৎস্য, পরিবহন, হস্তশিল্প, খাদ্যশিল্প, নৌযান, তথ্যপ্রযুক্তি, সংস্কৃতি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও লাভবান হন। মান্দারবাড়িয়াকে ঘিরে হাজারো তরুণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। উপকূলের মানুষের জীবনে আসতে পারে অর্থনৈতিক মুক্তি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী উপকূলীয় পর্যটন বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এবং এটি বহু দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাত। পরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে মান্দারবাড়িয়াও কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
তবে একটি বিষয় আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে। মান্দারবাড়িয়ার উন্নয়ন যেন কখনো কক্সবাজারের অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণের পুনরাবৃত্তি না হয়। এখানে উন্নয়ন হবে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের ভিত্তিতে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণী এবং উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের সুরক্ষা নিশ্চিত করেই পর্যটন বিকাশ ঘটাতে হবে। এটাই হবে বাংলাদেশের নতুন উন্নয়ন দর্শন।
একদিন হয়তো পৃথিবীর কোনো আন্তর্জাতিক পর্যটন সাময়িকীর প্রচ্ছদে লেখা থাকবে, “আবিষ্কার করুন বিশ্বের অনন্য ম্যানগ্রোভ সৈকত বাংলাদেশের মান্দারবাড়িয়া” সেই দিনটি কল্পনা নয়, বাস্তব হতে পারে। প্রয়োজন কেবল একটি জাতীয় সিদ্ধান্ত।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি মান্দারবাড়িয়াকে আরেকটি অবহেলিত উপকূল হিসেবে রেখে দেব, নাকি এটিকে বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক বিস্ময়ে রূপান্তর করব? ইতিহাস বলে, যে জাতি তার অনাবিষ্কৃত সম্পদকে চিনতে শেখে, ভবিষ্যৎ অর্থনীতির নেতৃত্বও তারাই দেয়। মান্দারবাড়িয়া সেই সুযোগগুলোর একটি, যা এখনো বাংলাদেশের হাতের নাগালেই আছে।
(মো. মামুন হাসান,ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান,ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।)
সম্পর্কিত সংবাদ
রাসুলুল্লাহ সাঃ- মুমিনের সর্বোত্তম আদর্শ
মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম সাদিক :: মানুষের জীবনে আদর্শের প্রয়োজন অপরিসীম। একজন মানুষ কীভাবে কথা বলবে,বিস্তারিত…
ঈদে মিলাদুন্নবীঃ ভালোবাসা, সুন্নাহ ও মানবতার শিক্ষা- মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম সাদিক
ইসলাম শান্তি, সাম্য, মানবতা ও উত্তম চরিত্রের ধর্ম। মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় হাবিব হজরতবিস্তারিত…


