ভোট: একটি পবিত্র আমানত ও সাক্ষ্য

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যা মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করে। ইসলামি জীবনদর্শনে মানুষ সমাজবদ্ধ জীব এবং তার প্রতিটি কাজই পরকালীন জবাবদিহিতার আওতাভুক্ত। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিনিধি নির্বাচনের প্রধান মাধ্যম হলো ভোট। সাধারণ নাগরিকের কাছে এটি কেবল একটি রাজনৈতিক অধিকার হিসেবে পরিচিত হলেও ইসলামের সুমহান আদর্শে এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। ভোটকে ইসলামে ‘আমানত’, ‘সাক্ষ্য’ (শাহাদাত) এবং ‘সুপারিশ’ (শাফায়াত) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। ফলে একজন মুমিনের জন্য ভোট প্রদান কেবল পার্থিব নাগরিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি তার ঈমানি ও নৈতিক দায়বদ্ধতার অংশ।

আমানত ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব
ইসলামে ‘আমানত’ শব্দটি অত্যন্ত ব্যাপক। এটি কেবল গচ্ছিত ধন-সম্পদ রক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষের ওপর অর্পিত প্রতিটি দায়িত্বই এক একটি আমানত। পবিত্র কুরআন মাজিদে মহান আল্লাহ এরশাদ করেছেন:”নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা যেন আমানতসমূহ তার হকদারদের নিকট পৌঁছে দাও।” (সূরা আন-নিসা: ৫৮)
মুফাসসিরিনে কেরাম এই আয়াতের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন যে, রাষ্ট্রীয় শাসনভার বা জনপ্রতিনিধিত্ব হলো একটি বিশাল আমানত। ভোটাররা তাদের ভোটের মাধ্যমে এই আমানতটি কার হাতে সমর্পণ করবেন, সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। যদি কোনো ভোটার জেনে-বুঝে কোনো অযোগ্য, দুর্নীতিবাজ বা নীতিহীন ব্যক্তিকে ভোট প্রদান করেন, তবে তিনি কার্যত আল্লাহর দেওয়া আমানতের খেয়ানত করলেন। রাসূলে কারীম (সা.) আমানতের গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে বলেছেন, “যার মধ্যে আমানতদারি নেই, তার মধ্যে ঈমান নেই।” (মুসনাদে আহমাদ)। সুতরাং ভোট প্রদান করার সময় এটি মনে রাখা জরুরি যে, আমি আমার এই আমানতটি কোনো যোগ্য হাতে তুলে দিচ্ছি কি না।

ভোট যখন সাক্ষ্য বা ‘শাহাদাত’
ইসলামি ফিকহবিদদের মতে, ভোট প্রদান করা মানে হলো সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে একটি সাক্ষ্য প্রদান করা। ভোটার যখন ব্যালট পেপারে সিল দেন, তখন তিনি আল্লাহর নামে এই সাক্ষ্য দেন যে— ‘আমার জানামতে এই ব্যক্তি সৎ, যোগ্য এবং অর্পিত দায়িত্ব পালনে সক্ষম।’ ইসলামে সাক্ষ্য প্রদানের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:”হে মুমিনগণ! তোমরা ইনসাফের সঙ্গে আল্লাহর জন্য সাক্ষী হয়ে দাঁড়াও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বা পিতা-মাতার ও নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে হয়।” (সূরা আন-নিসা: ১৩৫)
যদি কোনো ব্যক্তি ব্যক্তিগত সম্পর্ক, দলীয় অন্ধত্ব বা পার্থিব কোনো প্রলোভনে পড়ে কোনো অযোগ্য লোককে যোগ্য বলে ভোট দেয়, তবে তার সেই সাক্ষ্যটি হবে মিথ্যা। ইসলামে মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদানকে ‘শাহাদাতুজ জুর’ বা কবিরা গুনাহ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সহিহ বুখারির এক হাদিসে রাসূল (সা.) মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়াকে শিরক এবং পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়ার মতো ভয়াবহ পাপের সমতুল্য বলে ঘোষণা করেছেন। অতএব, ভোটের মাধ্যমে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া নিজের আখেরাতকে ধ্বংস করার শামিল।

সুপারিশ ও তার পরিণতি
ভোটকে ইসলামি দৃষ্টিতে এক ধরনের ‘সুপারিশ’ (শাফায়াত) হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। ভোটার তার সমর্থনের মাধ্যমে একজন প্রার্থীকে রাষ্ট্রীয় উচ্চপর্যায়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন। এই সুপারিশের প্রভাব সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন:”যে ব্যক্তি কোনো সৎ কাজে সুপারিশ করবে, সে তার সওয়াবের একটি অংশ পাবে। আর যে ব্যক্তি কোনো মন্দ কাজে সুপারিশ করবে, সে তারও একটি অংশ (গুনাহ) বহন করবে।” (সূরা আন-নিসা: ৮৫)
এই আয়াতের আলোকে, আপনি যদি একজন সৎ ও খোদাভীরু মানুষকে নির্বাচিত করেন, তবে তিনি সংসদে গিয়ে যত জনকল্যাণমূলক কাজ করবেন, সেই সওয়াবের একটি অংশ আপনি কবরে বসেও পাবেন। পক্ষান্তরে, আপনার ভোটে যদি একজন জালেম বা দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি ক্ষমতায় আসে, তবে তার প্রতিটি অপকর্ম ও জুলুমের দায়ভার আপনার কাঁধেও বর্তাবে। কারণ আপনার সুপারিশ বা ভোটই তাকে সেই সুযোগ করে দিয়েছে।

যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচনের ইসলামি মানদণ্ড
কাকে ভোট দিতে হবে বা কাকে প্রতিনিধি নির্বাচন করতে হবে, তার একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা ইসলাম দিয়েছে। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে একজন নেতার দুটি প্রধান গুণ থাকা আবশ্যক: ‘যোগ্যতা’ ও ‘সততা’।
হযরত ইউসুফ (আ.) যখন মিশরের খাদ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব চেয়েছিলেন, তখন তিনি নিজের দুটি গুণের কথা উল্লেখ করেছিলেন: “নিশ্চয়ই আমি হিফাজতকারী (বিশ্বস্ত) ও জ্ঞানবান (যোগ্য)।” (সূরা ইউসুফ: ৫৫)।
আবার হযরত মুসা (আ.)-এর ঘটনা বর্ণনায় কুরআনে এসেছে: “নিশ্চয়ই তোমার জন্য উত্তম কর্মচারী সে-ই, যে শক্তিশালী ও আমানতদার।” (সূরা আল-কাসাস: ২৬)।
রাসূলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, “যখন দায়িত্ব অযোগ্য ব্যক্তির হাতে অর্পণ করা হবে, তখন তোমরা কিয়ামতের অপেক্ষা করো।” (সহিহ বুখারি)। এখানে কিয়ামত মানে কেবল মহাপ্রলয় নয়, বরং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বিপর্যয়। অযোগ্য নেতৃত্বের কারণে সমাজে বিচারহীনতা, দারিদ্র্য ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে, যার চূড়ান্ত পরিণতিতে জাতি ধ্বংসের মুখে পতিত হয়। তাই ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রার্থীর ব্যক্তিগত চরিত্র, আমানতদারি এবং দেশ পরিচালনার দক্ষতা বিবেচনা করা অপরিহার্য।

ভোট কেনা-বেচা ও নৈতিক অবক্ষয়
বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থায় ভোট কেনা-বেচা একটি মারাত্মক ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থের বিনিময়ে ভোট দেওয়া বা নেওয়া ইসলামি শরীয়তে সরাসরি ‘রিশওয়াহ’ বা ঘুষের অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “ঘুষ দাতা এবং ঘুষ গ্রহণকারী উভয়ের ওপর আল্লাহর লানত।” (তিরমিজি)। ভোট বিক্রি করা কেবল একটি রাজনৈতিক অপরাধ নয়, বরং এটি নিজের ঈমান ও বিবেককে তুচ্ছ মূল্যে বিক্রি করে দেওয়ার নামান্তর। যে নেতা টাকা দিয়ে ভোট কেনেন, তিনি ক্ষমতায় গিয়ে সেই টাকা সুদে-আসলে জনগণের পকেট থেকেই উসুল করেন। ফলে দেশ দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী ভোটার ও প্রার্থী উভয়ই মহান আল্লাহর অভিশাপের ভাগীদার হন।

নাগরিক নিষ্ক্রিয়তা ও সাক্ষ্য গোপন করা
অনেকে হতাশায় ভোগেন যে, কোনো প্রার্থীই যোগ্য নয়—তাই ভোট দেব না। কিন্তু ইসলামে সত্য সাক্ষ্য গোপন করাও নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন:”তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না; যে ব্যক্তি তা গোপন করে, অবশ্যই তার অন্তর পাপী।” (সূরা আল-বাকারা: ২৮৩)
যদি কোনো এলাকায় সকল প্রার্থীই ত্রুটিপূর্ণ হয়, তবে ‘আখাফফুদ দারালাইন’ (দুটি মন্দের মধ্যে তুলনামূলক কম ক্ষতিকরটি গ্রহণ) নীতির ভিত্তিতে ভোটারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অর্থাৎ, তাদের মধ্যে যিনি নির্বাচিত হলে জনগণের ক্ষতি কম হবে এবং যিনি তুলনামূলকভাবে কম দুর্নীতিবাজ, তাকেই ভোট দেওয়া সময়ের দাবি। নিষ্ক্রিয় থাকা মানে অযোগ্যদের পথ আরও সুগম করে দেওয়া। অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হওয়া প্রতিটি মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব।

সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতায় ভোটারের ভূমিকা
একটি রাষ্ট্রের উন্নতি ও শান্তি নির্ভর করে তার শাসনব্যবস্থার ওপর। আর শাসনব্যবস্থা নির্ভর করে ভোটারদের সচেতনতার ওপর। ইসলামে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবন অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। আমরা যদি ব্যক্তিগত পছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে সামষ্টিক কল্যাণের কথা চিন্তা করে ভোট প্রদান করি, তবে সমাজ থেকে জুলুম ও অরাজকতা দূর হওয়া সম্ভব। ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, খুলাফায়ে রাশেদীনের আমলে জনমতের প্রতি কতটা গুরুত্ব দেওয়া হতো। যোগ্য প্রতিনিধি নির্বাচন করা মানে হলো একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে এক কদম এগিয়ে যাওয়া। আপনার একটি স্বাক্ষর বা একটি ভোট যেমন দেশ ও জাতিকে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ উপহার দিতে পারে, তেমনি একটি ভুল সিদ্ধান্ত দেশকে অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারে।

সুতরাং বলা যায়, ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট প্রদান কেবল একটি পার্থিব কাজ নয়, বরং এটি পরকালীন জবাবদিহিতার সাথে সম্পৃক্ত একটি বিশাল আমানত। এটি এমন এক সাক্ষ্য যা আল্লাহর দরবারে সংরক্ষিত থাকবে। তাই কোনো প্রলোভন, ভয়ভীতি বা সংকীর্ণ দলীয় আনুগত্যের বশবর্তী না হয়ে কেবল দেশ, জাতি এবং ইসলামের স্বার্থে যোগ্য ও আমানতদার ব্যক্তিকে নির্বাচিত করাই ঈমানের দাবি।

মোঃ যোবায়েরুল ইসলাম
প্রভাষক (আরবি), সাতক্ষীরা আলিয়া কামিল মাদ্রাসা।






সম্পর্কিত সংবাদ