ঝাউডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এম.এ কাশেমের বিরুদ্ধে গ্রাচুইটির টাকা আত্মসাতের বিরুদ্ধে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন
নিজম্ব প্রতিনিধি :: সংবাদ প্রচারের পর সাতক্ষীরা সদর উপজেলাধীন ঝাউডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ আবুল কাশেম এর বিরুদ্ধে অবসরপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক নজরুল ইসলাম ও পিয়ন আজিবর রহমানের গ্রাচ্যুইটির অর্থ আত্মসাতের টাকা সহ ভাউচারে ভুয়া বিল তৈরি করে স্কুল ফান্ডের সাড়ে ৫ লক্ষ টাকার আত্মসাতের সত্যতা পেয়েছেন তদন্ত কমিটি। বৃহস্পতিবার ১৬ই জুলাই দুপুরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন উক্ত স্কুলের এড্যাহক কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ খলিলুর রহমান। এর আগে বিগত ২৫শে জুন উক্ত প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র শিক্ষক অলিয়ার রহমানকে আহবায়ক করে ৫ সদস্য বিশিষ্ট এক তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেন। তদন্ত শেষে গত ১৩ই জুলাই উক্ত বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের গ্রাচ্যুইটির অর্থ আত্মসাত তদন্তের প্রতিবেদন প্রদান করেন।
সংশ্লিষ্ট তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, ঝাউডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন যাবত গ্রাচ্যুইটি ফান্ড, পি.এফ ফান্ড, স্কাউট ফান্ডসহ আরো অন্যান্য ফান্ড চালু ছিল। এমনকি প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক জনাব মোঃ আনোয়ারুল হক ও জনাব মোঃ রেজাউল করিম- এর সময়েও উক্ত ফান্ডসমূহ চালু ছিল। কোন শিক্ষক অবসরে গেলে গ্রাচ্যুইটি ফান্ড থেকে অবসর গ্রহণকারী শিক্ষক/কর্মচারীদের অবসরের টাকা প্রদান করা হয়। এ পর্যন্ত যত শিক্ষক অত্র প্রতিষ্ঠান থেকে অবসরে গেছেন তারা সবাই উক্ত ফান্ড থেকে অবসরের টাকা স্কুলের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী গ্রহণ করেছেন। কিন্তু বর্তমান প্রধান শিক্ষক জনাব এম.এ কাশেম অত্র স্কুলে যোগদান করার পর উক্ত ফান্ড সমূহ বন্ধ করে দেন। প্রধান শিক্ষক দাবি করেন যে প্রতিষ্ঠানের সকল হিসাব (পিএফ ব্যতীত) শুধু মাত্র একটি সাধারণ তহবিল বা হিসাবে অর্থ জমা ও সংরক্ষণ করিতে হইবে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৩১ জুলাই ২০২৩ ৭.১(খ) এ আছে- “শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আদায়কৃত অর্থ সাধারণ তহবিলে জমা রাখিতে হইবে”। তাছাড়া শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনার ৫। (ঘ) এ আছে- “সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড / বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক নির্ধারিত খাতের অর্থ প্রতিষ্ঠান আদায় করিবে এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড/ বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণপূর্বক জমা দিবে”। উল্লেখ্য যে সমস্থ অর্থ একটি তহবিলে জমা রাখিলেও যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানের ক্যাশ বহিতে হিসাব সংরক্ষণ করতে হবে যাহা করা হয় নাই। পি/এফ ফান্ড চালু রাখার বিধি থাকিলেও সম্পূর্ণ (ব্যক্তিগত) সিদ্ধান্তে জনাব এম এ কাশেম তাহা বিলুপ্ত করেন। প্রতিষ্ঠানের কোথাও তাহার কোনো হিসাব আলাদা ভাবে চালু রাখেন নাই। ইহা সরকারি নির্দেশনার পরিপন্থী বলে জানা যায়। আরো উল্লেখ থাকে যে, অত্র প্রতিষ্ঠানের সহকারী শিক্ষক জনাব শেখ নজরুল ইসলাম প্রথমে অফিস সহকারী হিসাবে ১৬/০৬/১৯৯০ তারিখে যোগদান করেন এবং ৩১/০৫/২০০১ইং তারিখে উক্ত পদ থেকে পদত্যাগ করেন। পরে তিনি সহকারী শিক্ষক হিসাবে ০১/০৮/২০০১ ইং তারিখে যোগদান করেন এবং ২৪/০৩/২০২৩ ইং তারিখে অবসর গ্রহণ করেন। প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী তিনি সর্বমোট ২,০৯,৫৪০/-( দুই লক্ষ নয় হাজার পাঁচ শত চল্লিশ) টাকা পাবেন। বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভা নং ২৪/০৭, তারিখ ০২/০৭/২০২৪ এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৫০,০০০/- (পঞ্চাশ হাজার) টাকা (১৪/১২/২০২৩ তারিখে) এবং সভা নং ২৫/০৬, তারিখ ১৫/০৫/২০২৫ ম্যানেজিং কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৫০,০০০/- (পঞ্চাশ হাজার) টাকা (০৭/০৭/২০২৪ তারিখে) চেকের মাধ্যমে নগদ গ্রহণ করেন। তিনি মোট ১,০০,০০০/- (এক লক্ষ) টাকা নগদ গ্রহণ করেন। অবশিষ্ট ১,০৯,৫৪০/- ( এক লক্ষ নয় হাজার পাঁচ শত চল্লিশ) টাকা পাওয়ার জন্য অত্র প্রতিষ্ঠানের সভাপতির কাছে আবেদন করেন। অত্র স্কুলের পিয়ন মোঃ আজিবর রহমান অত্র স্কুলে ০১/০৬/১৯৮১ তারিখে যোগদান করেন। এবং ০৬/০৪/২০২৫ তারিখে অবসর গ্রহণ করেন। বিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী তার মোট পাওনা ১,৩১,১২০/- ( এক লক্ষ একত্রিশ হাজার একশত বিশ) টাকা। অবসরের টাকা পাওয়ার জন্য তিনি প্রধান শিক্ষক নিকট আবেদন করেন। প্রধান শিক্ষক তাদের (জনাব শেখ নজরুল ইসলাম ও মোঃ আজিবর রহমান) আবেদন সভা নং- ২৫/০৬, তারিখ ১৫/০৫/২০২৫ ম্যানেজিং কমিটিতে উত্থাপন করেন এবং ঐ মিটিং তাদের অবসরের টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতি ভাবে গৃহীত হয়। কিন্তু প্রধান শিক্ষক জনাব এম এ কাশেম কমিটিকে অবহিত করেন যে উক্ত গ্রাচ্যুইটি ফান্ডে যথেষ্ট পরিমাণ টাকা নেই। তিনি স্কুল কমিটিকে ভুল তথ্য দিয়েছেন। কেননা ১৫/০৫/২০২৫ইং তারিখে উক্ত ফান্ডে ১,৫২,৩৫৬/- (এক লক্ষ বায়ান্ন হাজার তিনশত ছাপান্ন) টাকা ছিল। তার তিনদিন পর অর্থাৎ ১৮/০৫/২০২৫ইং তারিখে তিনি উক্ত ফান্ড থেকে ১,০৭,৭৮৪/- (এক লক্ষ সাত হাজার সাতশত চুরাশি) টাকা উত্তোলন করে শিক্ষক/কর্মচারীদের মধ্যে এপ্রিল-২৫ মাসের বেতন প্রদান করেন। যা তার স্বৈচ্ছাচারিতা ও শিক্ষামন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন ৩১/০৭/২০২৩, ৬।(খ) এর পরিপন্থী। পরবর্তীতে পিয়ন মোঃ আজিবর রহমানের আবেদনের কথা বিবেচনায় সভা নং ২৫/০৬, তারিখ ১৫/০৫/২০২৫ ইং ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক পিয়ন মোঃ আজিবর রহমান (২৯ জুলাই ২০২৫) কে চেকের মাধ্যমে নগদ ৫০,০০০/- (পঞ্চাশ হাজার) টাকা প্রদান করা হয়। অবশিষ্ট ৮১,২৩০/- (একাশি হাজার দুইশত ত্রিশ) টাকা পাওয়ার জন্য পুনরায় সভাপতির কাছে আবেদন করেন। অপর দিকে ভোকেশনাল বিভাগের গ্রাচ্যুইটি ফান্ড থেকে প্রধান শিক্ষক জনাব এম.এ কাশেম ১৬/০১/২০২৪ইং তারিখে ৩,৬৬,০০০/-(তিন লক্ষ ছেষট্টি হাজার) টাকা উত্তোলন করেন যা সম্পূর্ণ নিয়ম বহির্ভূত ও বে-আইনী। উল্লেখ থাকে যে, তিনি বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির রেজুলেশনও সম্পন্ন করেন নাই। উক্ত সমুদয় অর্থ আত্মসাৎ করেন। কেননা প্রতিষ্ঠানের কোন ব্যাংক হিসাব, ক্যাশবই -এ কোথাও উক্ত টাকার উল্লেখ নাই। এটি সরাসরি প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাৎ দন্ডে দন্ডনীয়। প্রধান শিক্ষক এম এ কাশেম ১৬/০১/২০২৪ইং তারিখে উক্ত টাকা উত্তোলন পূর্বক এক বছর পরে (২৯/০৩/২০২৫ইং) তা কিভাবে বিতরণ করেন। যে অর্থ প্রতিষ্ঠানে প্রদর্শিত আয় হিসাবে দেখানো হয় নাই তার খরচের ভাউচার কোথা থেকে আসে। তাছাড়া প্রতিষ্ঠান প্রধান বেতন বিলের যে সমস্ত কাগজ পত্র দিয়েছেন তাহা পরবর্তীতে দ্রুততার সহিত বানানো কেননা মূল বহিতে ওভার রাইটিং, ফ্লুইড ব্যবহৃত। এটা অগ্রহণযোগ্য, কেননা তার কোন কোনোটাতে সিল নেই, স্বাক্ষর নেই, এমনকি ভিন্ন ভিন্ন তারিখ ও কাটাকাটি। যেহেতু উক্ত টাকা কেবলমাত্র অবসর গ্রহণকারী শিক্ষক/কর্মচারীদের জন্য সংরক্ষিত, তাই উক্ত টাকা সংশ্লিষ্ট খাত ব্যতীত অন্য খাতে ব্যয় বা স্থানান্তর করার কোন সুযোগ নাই।
উল্লেখ্য থাকে যে, গ্রাচ্যুইটি ফান্ড আত্মসাৎ তদন্ত কমিটি তদন্ত কাজ পরিচালনা করতে গিয়ে দেখেন যে ঝাউডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধিনস্থ (০৯)নং দোকান ঘরটি ভাড়ার জামানত বাবদ ০৫/১২/২০২৩ তারিখে ১,৮৭,২০০/- (এক লক্ষ সাতাশি হাজার দুইশত) টাকা অত্র প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক এম,এ কাশেম নগদে গ্রহণ করেন।উক্ত টাকা প্রতিষ্ঠানের কোন ব্যাংক হিসাব বা ক্যাশ বহিতে জমা প্রদান করেন নাই। সুতরাং উক্ত টাকা তিনি নিজেই আত্মসাৎ করেছেন বলে প্রতীয়মান হয়।
উক্ত স্কুলের এড্যাহক কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ খলিলুর রহমান সর্বশেষ বক্তব্যে বলেন, এ তদন্ত রিপোর্টের আলোকে প্রধান শিক্ষককে ১-২দিনের মধ্যে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হবে। সকল উদ্ধতন কর্মকর্তাকে অবহিত করা হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়ম অনুযায়ী এবং সরকারি বিধি মোতাবেক এই দুর্নীতিবাজ ও অর্থ আত্মসাতকারী প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা সহ অবিলম্বে প্রধান শিক্ষক মোঃ আবুল কাশেমের চাকরি থেকে বরখাস্ত সহ শাস্তির দাবি জানান স্থানীয়রা।
সম্পর্কিত সংবাদ
ঝাউডাঙ্গায় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা অনুষ্ঠিত
এসএম আব্দুল্লাহ : : উৎসবমুখর ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য পরিবেশের মধ্য দিয়ে ঝাউডাঙ্গায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতমবিস্তারিত…
ঝাউডাঙ্গায় প্রধান শিক্ষক কাশেমের বিরুদ্ধে চাকরি দেওয়ার নামে ১৪ লক্ষ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
ডেস্ক নিউজ :: সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঝাউডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ আবুল কাশেমের বিরুদ্ধেবিস্তারিত…


