মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম সাদিক
কিশোর গ্যাংয়ের দায় কার?
কিশোর গ্যাং—এ শব্দ দুটি এখন আর কেবল শহরের অলিগলি কিংবা অপরাধপ্রবণ কিছু এলাকার সঙ্গে সীমাবদ্ধ নেই বরং গ্রামের মানুষের সাথে বেশ পরিচিত। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কিশোরদের সংঘবদ্ধ হয়ে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে ক্রমেই বাড়ছে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মারামারি, মাদক ব্যবসা, ইভটিজিং, এমনকি হত্যার মতো গুরুতর অপরাধেও কিশোরদের সম্পৃক্ততার খবর প্রায় প্রতিদিন সংবাদপত্রের শিরোনাম হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে—এই কিশোররা কি জন্মগতভাবেই অপরাধী? নাকি তাদের অপরাধী হয়ে ওঠার পেছনে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতা রয়েছে? বাস্তবতা হলো, কিশোর গ্যাংয়ের দায় এককভাবে কিশোরদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে সমস্যার সমাধান অদৌও সম্ভব নয়।
একজন কিশোর যখন অপরাধী চক্রের সদস্য হয়ে ওঠে, তখন তার পেছনে থাকে নানা ধরনের সামাজিক ও পারিবারিক বিশেষ কারণ। কৈশোর এমন একটি সময়, যখন একজন মানুষ পরিচয়, স্বীকৃতি ও বন্ধুত্বের জন্য প্রবলভাবে আকাঙ্ক্ষী থাকে। পরিবারে পর্যাপ্ত সময়, ভালোবাসা ও নজরদারির অভাব হলে সে সহজেই বিকল্প আশ্রয় খুঁজতে তার পথ আরো সহজ হয়ে যায়। অনেক সময় সেই আশ্রয় হয়ে ওঠে বন্ধুমহল বা কোনো সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী। সেখানে সে পায় তথাকথিত ‘ক্ষমতা’, ‘প্রভাব’ ও ‘ভাই’ পরিচয়ের স্বীকৃতি লাভ করে। ধীরে ধীরে সেই সম্পর্কই তাকে অপরাধের দিকে ধাবিত করে।
কিশোর গ্যাং-এ ক্ষেত্রে পরিবারের দায় অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কী করছে—এসব বিষয়ে অনেক অভিভাবকেরই নজরদারিতে উদাসীন। কেউ কেউ সন্তানের সব ধরনের আবদার পূরণ করাকেই দায়িত্ব মনে করেন, কিন্তু তার মানসিক বিকাশ ও মূল্যবোধ গঠনের বিষয়ে উদাসীন থাকেন। আবার অনেক পরিবারে দাম্পত্য কলহ, বিচ্ছিন্নতা, অর্থনৈতিক সংকট কিংবা পারিবারিক অস্থিরতা কিশোরের মানসিক জগতে গভীর ক্ষত তৈরি করে। তাই সন্তানকে শুধু শাসন নয়, তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা একান্ত জরুরি।
তবে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারের জন্য শুধু পরিবারকে দায়ী করলে বাস্তব চিত্র অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। সমাজেরও বড় দায় রয়েছে। একটি পাড়া-মহল্লায় কিছু কিশোর দিনের পর দিন প্রকাশ্যে আড্ডা দিচ্ছে, মাদক গ্রহণ করছে, অস্ত্র প্রদর্শন করছে কিংবা ভয়ভীতি সৃষ্টি করছে—এ দৃশ্য দেখেও যদি সমাজ নীরব থাকে, তবে সেই নীরবতাও এক ধরনের প্রশ্রয়। সামাজিক নেতৃত্ব, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব—সবারই দায়িত্ব রয়েছে কিশোরদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়া। বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে, কিছু অপরাধীচক্র কিশোরদের ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে। মিছিল-মিটিং, আধিপত্য বিস্তার, দখল, চাঁদাবাজি কিংবা প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর কাজে কিশোরদের ব্যবহার করা হলে তাদের অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়ে। কিশোরদের হাতে অপরাধের হাতেখড়ি দিয়ে পরে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। তাই কিশোর গ্যাং দমনে শুধু কিশোরদের গ্রেপ্তার নয়, তাদের পেছনে থাকা গডফাদারদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
রাষ্ট্রের দায়িত্বও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলাধুলার মাঠ নেই, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ সীমিত, পাঠাগার ও বিনোদনকেন্দ্রের সংকট রয়েছে। অনেক এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে কিশোরদের সুস্থ বিনোদনের কোনো পরিবেশ নেই। ফলে অবসর সময়ের একটি বড় অংশ তারা ব্যয় করছে মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা অনিয়ন্ত্রিত আড্ডায়। প্রযুক্তি নিজে সমস্যা নয়; কিন্তু এর অপব্যবহার, সহিংস কনটেন্টের প্রভাব এবং অপরাধীচক্রের অনলাইন যোগাযোগ কিশোরদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
তাই কিশোর গ্যাং দমনে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়মিত অভিযান চালানোর পাশাপাশি অপরাধের মূল হোতাদের শনাক্ত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং ও নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। প্রতিটি এলাকায় খেলাধুলা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সৃজনশীল চর্চার সুযোগ তৈরি করতে হবে। পরিবারকে সন্তানের সঙ্গে সময় কাটাতে হবে এবং তার বন্ধু ও দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে কিশোর অপরাধীদের ক্ষেত্রে শাস্তির পাশাপাশি সংশোধন ও পুনর্বাসনের সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, কিশোর গ্যাংকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে সামাজিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আজ যে কিশোরটি অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, সে একদিন আমাদেরই সমাজের পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হবে। তাকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়ে আমরা আসলে নিজেদের ভবিষ্যৎকেই অনিরাপদ করছি।
কিশোর গ্যাংয়ের দায় শুধু কিশোরদের নয়। দায় পরিবারের, সমাজের, রাষ্ট্রের এবং সেইসব প্রভাবশালী ব্যক্তির, যারা নিজেদের স্বার্থে কিশোরদের ব্যবহার করে। এখন প্রয়োজন দোষারোপের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে সমস্যার গভীরে যাওয়া। একটি শিশুকে অপরাধী হওয়ার আগেই যদি আমরা সঠিক শিক্ষা, ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও সুন্দর ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিতে পারি, তাহলেই কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধ করা সম্ভব। কারণ কিশোরদের হাতে অস্ত্র নয়—বই, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও স্বপ্ন তুলে দিতে পারলেই একটি নিরাপদ সমাজ ও দেশ গড়ে উঠবে।
সম্পর্কিত সংবাদ
বিষণ্ননতা: নীরব এক মরণব্যাধি
মানুষের জীবনে দুঃখ, কষ্ট, হতাশা কিংবা মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু যখন এই মনবিস্তারিত…
মে দিবস উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাবে বিড়ি শ্রমিকদের র্যালি ও সমাবেশ
মহান মে দিবস উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাবে র্যালি ও সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ বিড়ি শ্রমিক ফেডারেশন। বৃহস্পতিবারবিস্তারিত…


