ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট : যে শিক্ষা মানচিত্রের সীমানা মানে না

ভোরের সুন্দরবন কুয়াশার পাতলা চাদর সরিয়ে নদীর বুকে যখন ধীরে ধীরে জেগে ওঠে, নৌকার গলুই ছুঁয়ে যখন জোয়ারের জল ফিরে যায়, তখন মনে হয় প্রকৃতি যেন নীরবে একটি প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে। এই সৌন্দর্যের উত্তরাধিকার আমরা পেয়েছি, কিন্তু এর গল্প পৃথিবীকে শোনাবে কে?

হয়তো সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এর ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ছোট শ্রেণিকক্ষে বসে থাকা সেই তরুণ, যার সামনে কয়েকটি বেঞ্চ, একটি বোর্ড আর একটি ব্যবহারিক ল্যাব। অথচ তার চোখের ভেতর কোনো শ্রেণিকক্ষ নেই। সেখানে আছে বিমানবন্দর, আন্তর্জাতিক হোটেল, সমুদ্রযাত্রা, অচেনা শহর আর পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষের সঙ্গে কাজ করার স্বপ্ন। স্বপ্নের অদ্ভুত নিয়ম হলো, মানুষ যেখানে দাঁড়িয়ে থাকে, স্বপ্ন সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে না।

সাতক্ষীরা সুন্দরবনের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু সুন্দরবনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকব, নাকি সুন্দরবনের সম্ভাবনার পাশে দাঁড়াব? প্রকৃতি আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে। বন দিয়েছে, নদী দিয়েছে, গ্রাম দিয়েছে, খাবার দিয়েছে, সংস্কৃতি দিয়েছে, মানুষের আন্তরিকতা দিয়েছে। কিন্তু প্রকৃতি কখনো নিজে নিজে পর্যটন শিল্প তৈরি করে না। সৌন্দর্যকে অভিজ্ঞতায়, অভিজ্ঞতাকে সেবায় এবং সেবাকে অর্থনীতিতে রূপ দিতে হয় মানুষকে।সেই মানুষ তৈরির শিক্ষা ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট।

একজন প্রশিক্ষিত তরুণের চোখে একটি নদী শুধু নদী নয়। সেখানে সে দেখে একটি নৌভ্রমণের সম্ভাবনা। একটি গ্রামের উঠান শুধু উঠান নয়, সেখানে সে খুঁজে পায় গ্রামীণ পর্যটনের গল্প। মায়ের রান্নাঘরের একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার শুধু খাবার নয়, সেটি হয়ে উঠতে পারে একটি গ্যাস্ট্রোনমিক পরিচয়।যে চোখ শুধু সৌন্দর্য দেখে, সে পর্যটক।যে চোখ সৌন্দর্যের ভেতর সম্ভাবনা দেখে, সে পর্যটন পেশাজীবী।

দার্শনিক সেনেকার সেই কথাটি এখানে যেন নতুন অর্থ পায়, “ভাগ্য প্রস্তুত মানুষকেই সাহায্য করে।” সম্ভাবনা আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে। কিন্তু সম্ভাবনার দরজায় কড়া নাড়ার জন্য দরকার জ্ঞান, দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস।এই শিক্ষা তাই শুধু হোটেলের রিসেপশনে দাঁড়িয়ে অতিথিকে স্বাগত জানানোর শিক্ষা নয়। এটি মানুষের মন পড়ার শিক্ষা। ভিন্ন সংস্কৃতিকে সম্মান করার শিক্ষা। সেবাকে পেশা থেকে শিল্পে উন্নীত করার শিক্ষা। একটি স্থানকে শুধু দেখার নয়, তার গল্প আবিষ্কার করার শিক্ষা।

আজকের পৃথিবীতে একজন দক্ষ হসপিটালিটি পেশাজীবী কখনো ব্যবস্থাপক, কখনো যোগাযোগকারী, কখনো সমস্যা সমাধানকারী, কখনো উদ্যোক্তা। তার কর্মক্ষেত্র একটি শহরে আটকে নেই। হোটেল থেকে রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট থেকে এয়ারলাইনস, ট্রাভেল কোম্পানি থেকে ক্রুজ শিপ, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট থেকে নিজস্ব উদ্যোগ, সম্ভাবনার দরজা বহু। তাহলে সাতক্ষীরার তরুণ সেই দরজায় দাঁড়াবে না কেন? আমরা কেন শুধু বিদেশি পর্যটনের ভোক্তা হব, পেশাজীবী হব না? কেন অন্য দেশের হোটেলে অতিথি হব, কিন্তু একদিন সেই হোটেলের ব্যবস্থাপক হব না? কেন সুন্দরবনের ছবি বিদেশিরা তুলবে, আর তার গল্প বলার মানুষ হবে অন্য কেউ? প্রশ্নগুলো আসলে চাকরির নয়। প্রশ্নগুলো আত্মপরিচয়ের।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির।” আজকের তরুণের ভয়শূন্যতা মানে শুধু সাহস নয়; নিজের সামর্থ্যের প্রতি বিশ্বাস। সাতক্ষীরায় জন্ম নেওয়া মানে সাতক্ষীরাতেই ভবিষ্যৎ আটকে রাখা নয়। বরং এই মাটি থেকেই পৃথিবীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার প্রস্তুতি নেওয়া।হয়তো কোনো তরুণ একদিন সুন্দরবনের পাশে একটি পরিবেশবান্ধব হোমস্টে গড়ে তুলবে। কেউ স্থানীয় খাবারকে ব্র্যান্ড বানাবে। কেউ নদীপথে নতুন পর্যটন অভিজ্ঞতা তৈরি করবে। কেউ আন্তর্জাতিক হোটেলে নেতৃত্ব দেবে। কেউ হয়তো নিজের প্রতিষ্ঠান তৈরি করে আরও দশজন তরুণের কর্মসংস্থানের দরজা খুলে দেবে।তখন পর্যটন শুধু ভ্রমণ থাকবে না। হয়ে উঠবে জীবিকার ভাষা।সংস্কৃতির নতুন বাজার।গ্রামের নতুন পরিচয়।আর তরুণের হাতে নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণের শক্তি।

কাজী নজরুল ইসলামের উচ্চারণ, “যে পথে চলে না কেউ, সে পথের পথিক হতে হয়।” আমাদের তরুণদেরও হয়তো সেই অচেনা পথের পথিক হতে হবে। কারণ পৃথিবী এখন শুধু ডিগ্রি খোঁজে না। পৃথিবী খোঁজে দক্ষতা। শুধু কর্মী খোঁজে না, খোঁজে অভিজ্ঞতা নির্মাতা। শুধু চাকরিপ্রার্থী খোঁজে না, খোঁজে উদ্যোক্তা।আর সেই কারণেই একটি ছোট শ্রেণিকক্ষকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।হয়তো সেখানে বসে থাকা কোনো শিক্ষার্থী আজও জানে না তার গন্তব্য কোথায়। কিন্তু তার হাতে যদি দক্ষতা থাকে, চোখে যদি স্বপ্ন থাকে, আর নিজের মাটির সম্ভাবনাকে দেখার মতো দৃষ্টি থাকে, তবে গন্তব্যের অভাব হবে না।কারণ পৃথিবীর মানচিত্রে গন্তব্য অনেক।প্রয়োজন শুধু এমন একজন মানুষ, যে যাত্রা শুরু করার সাহস রাখে।

সুন্দরবনের কাদামাটি থেকে যে নৌকা নদীতে নামে, তার গন্তব্য হয়তো কাছের কোনো চর। কিন্তু সেই নৌকার পাশে বসে থাকা একটি তরুণের স্বপ্ন? তার গন্তব্য হয়তো পুরো পৃথিবী।

লেখক: মো. মামুন হাসান,ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান,ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ,সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।






সম্পর্কিত সংবাদ

  • সমুদ্র পর্যটনে নতুন সম্ভাবনা সুন্দরবনের সৈকত
  • সাতক্ষীরা নিউজ এর পক্ষ থেকে দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা
  •  কলারোয়া গ্রামঞ্চল থেকে বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী ধানের গোলা
  • ডেলিভারি সম্পর্কে ধারনা পাল্টে দিল আদ্-দ্বীন হাসপাতাল
  • দেশের স্বার্থে বিএনপি-জামায়াত ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা
  • অনলাইন সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা: প্রেক্ষিত সাতক্ষীরা