ইসলামে ইতেকাফের গুরুত্ব ও মহত্ব

আল্লাহকে একান্ত কাছে পাবার জন্য, গভীর মনোযোগ দিয়ে ডাকার জন্য, দুনিয়ার সমস্ত কাজকর্ম থেকে নিজেকে বিরত রেখে নির্জনে নিবিড় ইবাদতে মাশগুল থাকার অন্যতম মাধ্যম হলো ইতেকাফ।

পবিত্র মাহে রমজানের শেষ দশকের কোন এক রজনীতে পবিত্র কুরআন মাজিদ নাযিল করা হয়। আর এ রজনীই লাইলাতুল কদর নামে পরিচিত। তবে ঠিক কোর তারিখে কুরআন নাযিল হয়েছে এটি রাসুল (দ) স্পষ্টভাবে বলে যাননি। শুধু এটুকু বলে গেছেন শেষ দশকের কথা। আল্লাহ বলেছেন, ‘নিশ্চয় আমি ইহা (কুরআন ) নাযিল করেছি পবিত্র রজনীতে (কদরের রাতে)।’
আর এ রাতের গুরুত্ব আল্লাহ নিজেই বর্ণনা করেছে সুরা কদরে। তিনি বলেন, ‘লাইলাতুল কদর হচ্ছে এমন রজনী যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।’ এতে বুঝা যায় এ রজনীতে ইবাদত করলে সাধারন হাজার মাস ইবাদত করার চেয়ে উত্তম।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে এ রজনী যেহেতু নির্ধারিত কোন তারিখ বলা হয়নি, তাই রমজানের শেষ দশ দিনের কোন এক রজনী হতে পারে। তাই এ রজনীর সুভাগ্য পেতে আল্লাহর রাসুল রমজান মাসের শেষ দশ দিন ইতেকাফ করতেন। এ রজনী তালাশ করা প্রত্যেক উম্মতের জন্য কর্তব্য। তবে ইতেকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা আল কেফায়া। এটি সবাইকে পালন না করলেও মহল্লাবাসীদের মধ্যে কোন একজনকে আদায় করা ওয়াজিব। অন্যথায় সবাই গোনাগার হবেন।

একজন মুসলিম কেন ইতিকাফ করবে” ?

একজন মুসলিম তিনটি কারণে ইতিকাফ করবে, যথা-
১- একটি ইসলামের বিধান মান্য করার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করার উদ্দেশ্যে ।
২-মানবীয় পাশবিক প্রবণতা এবং অহেতুক কাজ থেকে দুরে থাকার চর্চা।
৩- শবে কদর তালাশ করার উদ্দেশ্যে।
মহানবী (সা.) বলেন, আমি লাইলাতুল কদরের সৌভাগ্য ও মহিমা অনুসন্ধানে প্রথম দশদিন ও মাঝের দশদিন এতেকাফ করেছি অবশেষে আমার কাছে একজন ফেরেশতা এসে বলেছেন, লাইলাতুল কদর শেষ দশকে। কাজেই তোমাদের মধ্যে যারা লাইলাতুল কদরকে অর্জন করতে চায়, তারা যেন শেষ দশকে এতেকাফ করে।
ইতেকাফের ফজিলত ও গুরুত্ব :
ইতেকাফের গুরুত্ব সম্পর্কে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি মাহে রমজানের শেষ ১০ দিন ইতেকাফ করবে, সে ব্যক্তি দুটি পবিত্র হজ ও দুটি পবিত্র উমরার সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবে।

রাসূল (সা.) আরও বলেছেন, ইতেকাফকারী গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে এবং আমল না করেও তারা আমলকারীদের নেকির পরিমাণ নেকির মালিক হয়।–তিরমিযি
হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা.) দুনিয়াতে যতদিন জীবিত ছিলেন, ততদিন রমজানের শেষ ১০ দিন মসজিদে ইতেকাফ করেছেন। জীবিত থাকাকালীন কোনো রমজানের শেষ ১০ দিন ইতেকাফ বাদ দেননি। -বুখারি, মুসলিম।

ইতেকাফের প্রকারভেদ:
ইতেকাফ প্রধানত তিন প্রকার। যেমন- ১. ওয়াজিব ইতেকাফ, ২. সুন্নাত ইতেকাফ ও ৩. মুস্তাহাব ইতেকাফ।

ওয়াজিব ইতেকাফ : মান্নতের ইতেকাফ ওয়াজিব। চাই তা শর্তে হোক কিংবা হোক বিনা শর্তে। শর্তে হবার অর্থ হচ্ছে, কারো একথা বলা, আমার অমুক উদ্দেশ্য হাসিল হলে আমি ইতেকাফ করবো। ওয়াজিব ইতেকাফ কমপক্ষে একদিন হতে হবে। ওয়াজিব ইতেকাফের জন্য রোজা রাখা শর্ত। আবার সুন্নাত ইতেকাফ ভঙ্গ হয়ে গেলে তা কাজা করাও ওয়াজিব।

হাদিসে আছে, হযরত ওমর (রা.) একদিন রাসূলকে (সা.) বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! জাহেলী যুগে আমি মসজিদে হারামে এক রাত ইতেকাফ করার মান্নত করেছিলাম। হুজুর (সা.) বললেন, তোমার মান্নত পূর্ণ করো। (বুখারী)

সুন্নাত ইতেকাফ : রমজান মাসের শেষ দশদিনের ইতেকাফ হচ্ছে সুন্নত। (কেবলমাত্র হানাফী মাযহাবে রমজানের শেষ দশ দিনের) এ ইতেকাফ হচ্ছে সুন্নতে মুয়াক্কাদা। তবে কিছু সংখ্যক লোক ইতেকাফ করলে অন্যরা দায়িত্বমুক্ত হবে বলে এ মযহাবের রায়। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, হুযুর (স) সব সময় রমজানের শেষ দশদিন ইতেকাফ করতেন। ইন্তেকাল পর্যন্ত এ নিয়ম তিনি পালন করেছেন।
তার ইন্তেকালের পর তার স্ত্রীগণ ইতেকাফের সিলসিলা জারি রাখেন। (বুখারী)

মুস্তাহাব ইতেকাফ : রমজানের শেষ দশ দিন ব্যতীত অন্য যে কোনো সময় ইতেকাফ করা মুস্তাহাব। মুস্তাহাব ইতেকাফের জন্য কোনো সময় নির্দিষ্ট নেই।অর্থাৎ কিছু সময়ের জন্য ইতেকাফের নিয়তে মসজিদে অবস্থান করা।যতক্ষণ চায় করতে পারে। রোজারও প্রয়োজন নেই। এমনকি যখনই মসজিদে প্রবেশ করবে নফল ইতেকাফের নিয়ত করা সুন্নাত। এ ইতেকাফ সামান্য সময়ের জন্যও হতে পারে কিংবা এক দিন বা একাধিক দিনের জন্যও হতে পারে।

এই তিন ধরনের ইতেকাফের ভিন্ন ভিন্ন বিধান আছে। এখানে শুধু সুন্নাত ইতেকাফের কিছু বিধান আলোচনা করা হলো। সুন্নাত ইতেকাফকারীদের ২০ রমজানের সূর্যাস্তের আগে মসজিদের সীমানায় প্রবেশ করতে হবে। শেষ ১০ দিনের ইতেকাফ সুন্নাতে মুআক্কাদা কিফায়া। অর্থাৎ মহল্লার যেকোনো একজন ইতেকাফ করলে পুরো মহল্লাবাসীর পক্ষ থেকে ইতেকাফ আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু মহল্লার একজন ব্যক্তিও যদি ইতেকাফ না করে তবে মহল্লার সবার সুন্নাত পরিত্যাগের গোনাহ হবে। (শামী)

ইতেকাফ যাঁরা করতে পারবেন :

ইতেকাফের জন্য জরুরি হলো, মুসলমান হওয়া, সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হওয়া। সুতরাং কাফের এবং মাতাল লোকের ইতেকাফ জায়েজ নেই। নাবালেগ তবে বুঝ হয়েছে- এমন বাচ্চা যেরূপ নামাজ, রোজা পালন করতে পারে, তেমনি ইতেকাফও করতে পারে। (বাদায়েউস সানায়ে)

নারীদের ইতেকাফ : হাদিস থেকে জানা যায, নারীরাও ইতেকাফ করতে পারে। নারীদের ইতেকাফ গৃহকোণে (নামাজের স্থানে) বাঞ্ছনীয়। নারীদের ইতেকাফের জন্য স্বামীর অনুমতি আবশ্যক। সন্তান প্রসব করলে বা গর্ভপাত হলে কিংবা ঋতুরাব দেখা দিলে ইতেকাফ ছেড়ে দিতে হবে। নারীরাও ঘরে ওয়াজিব ইতেকাফ এবং সুন্নাত ইতেকাফে শর্ত হলো রোজাদার হতে হবে। যার রোজা হবে না তার ইতেকাফ শুদ্ধ হবে না। তবে নফল ইতেকাফে রোজা আবশ্যক নয়।

ইতেকাফের শর্তাবলী : ১. মুসলমান হওয়া। ২. বালেগ ও আকেল হওয়া। ৩. পবিত্র থাকা। ৪. ইতেকাফের নিয়ত করা। ৫. পূর্ণাঙ্গ সময় (আবশ্যকীয় প্রয়োজন ব্যতীত) মসজিদে অবস্থান করা ইত্যাদি।

ইতেকাফ অবস্থায় করণীয়: ইতেকাফ অবস্থায় আল্লাহর জিকির, তাসবিহ, ইস্তেগফার, দরূদ, কুরআন তিলাওয়াত ও জ্ঞানচর্চা করা মুস্তাহাব। মসজিদে থেকে করা সম্ভব এমন সব ইবাদতই ইতেকাফ অবস্থায় করা যায়।

যে সব কারণে ইতেকাফ বাতিল হয়ে যাবে:

১. মসজিদ বা ইতেকাফের স্থান থেকে নিস্প্রয়োজনে বের হলে। ২. ইসলাম পরিত্যাগ করলে। ৩. অজ্ঞান, পাগল বা মাতাল হলে| ৪. নারীদের মাসিক দেখা দিলে। ৫. সন্তান ভূমিষ্ট হলে বা গর্ভপাত হলে। ৬. সহবাস করলে । ৭. ইচ্ছাকৃত বীর্যপাত ঘটালে।

যে সব কারণে ইতেকাফ ভাঙা জায়েজ:

নিন্মোক্ত কারণে ইতেকাফ ভেঙ্গে দেওয়া জায়েজ, যথা-

ইতেকাফকারী যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে, যার চিকিৎসা মসজিদের বাইরে যাওয়া ছাড়া সম্ভব নয় তবে তার জন্য ইতেকাফ ভেঙে দেওয়ার অনুমতি আছে। (শামী)
বাইরে কোনো লোক ডুবে যাচ্ছে বা আগুনে দগ্ধ হচ্ছে তাকে বাঁচানোর আর কেউ নেই, অনুরূপ কোথাও আগুন লেগেছে, নেভানোর কেউ নেই তবে অন্যের প্রাণ বাঁচানোর এবং আগুন নেভানোর জন্য ইতেকাফকারীর ইতেকাফ ভেঙে দেওয়ার অনুমতি আছে।
জোরপূর্বক মসজিদ থেকে ইতেকাফকারীকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয় যেমন ওয়ারেন্ট এসে গেলে ইতেকাফ ভেঙে দেওয়া জায়েজ। সেরূপ ইতেকাফকারীর যদি এমন সাক্ষ্য দেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে, যা শরিয়তানুযায়ী তার জন্য ওয়াজিব সেরূপ সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ইতেকাফ ছেড়ে যাওয়ার অনুমতি আছে।
মা-বাবা, স্ত্রী, সন্তান-সন্ততির অসুস্থতার কারণেও ইতেকাফ ভেঙে দেওয়া জায়েজ। তেমনি পরিবারের কারো প্রাণ, সম্পদ বা ইজ্জত আশঙ্কার সম্মুখীন হলে এবং ইতেকাফ অবস্থায় তা প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা সম্ভব না হলে ইতেকাফ ভেঙে দেওয়া জায়েজ।
এ ছাড়া যদি কোনো জানাজা হাজির হয় এবং জানাজা পড়ানোর কেউ না থাকে তখনো ইতেকাফ ভেঙে দেওয়া জায়েজ। (ফতহুল কবীর) উল্লিখিত প্রয়োজন পূরণ করতে বের হলেই ইতেকাফ ভেঙে যাবে, তবে গোনাহ হবে না। (বাহরুর রায়েক)

ইতেকাফ ভেঙে গেলে করণীয় :

কোন কারণে ইতেকাফ নষ্ট হয়ে গেলে উত্তম হলো বাকি দিনগুলোও পূর্ণ করা। আবার ইতেকাফ নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর ইতেকাফকারী মসজিদ থেকে চলেও আসতে পারে, তাতে কোনো সমস্যা নেই। আবার এক দিন পরে গিয়ে নফল ইতেকাফের নিয়ত করে মসজিদে আবার ইতেকাফ শুরুও করতে পারে, তাও জায়েজ আছে। যেদিন ইতেকাফ নষ্ট হয়েছে শুধু সে দিনেরই কাজা করা ওয়াজিব। পুরো ১০ দিনের কাজা করা ওয়াজিব নয়। (শামী)

ডাঃ হাফেজ মাওলানা মোঃ সাইফুল্লাহ মানসুর






সংযুক্তিমূলক সংবাদ ..

  • ডেঙ্গু রোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে-শিক্ষা উপমন্ত্রী
  • একাত্তর আমার প্রাণ
  • বস্তি থেকে উচ্চশিক্ষা নিতে আমেরিকা যাচ্ছেন সিয়াম
  • প্রাকৃতিক দূর্যোগ থেকে রক্ষা পেতে হলে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে হবে – কুয়েট ভাইস-চ্যান্সেলর
  • নর্দান ইউনিভার্সিটিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী বছরব্যাপী কর্মসূচীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান
  • প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরলে ৭ কলেজের বিষয়ে সিদ্ধান্ত
  • সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিলের আন্দোলনে তালাবদ্ধ ঢাবি
  • ঈদের আগে ৪০তম বিসিএসের ফল
  • Leave a Reply