নড়াইলে মধুমতির চার যুগ ধরে ভাঙন : নদীর মধ্যে স্কুল রেখেই চলছে ক্লাস


উজ্জ্বল রায়, নড়াইল জেলা প্রতিনিধি :: নড়াইলে মধুমতির প্রয় চার যুগ ধরে ভাঙন নদীর মধ্যে স্কুল রেখেই চলছে ক্লাস! গত কয়েক বছরে নড়াইলের মধুমতি নদীর তীব্র ভাঙনে নদী তীরবর্তী স্কুলগুলো ভেঙে গেলেও কোন পদক্ষেপ নেয়নি পানি উন্নয়ন বোর্ড।

সম্প্রতি কয়েকটি এলাকায় কাজ শুরু হলেও ধীরগতি আর সময়ক্ষেপণের ফলে স্কুলগুলো নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ভাঙন কবলিত এলাকায় নদী বাধের কাজ না করায় স্কুলগুলোতে লেখাপড়া বন্ধ হবার উপক্রম। পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতিতে নদীগর্ভে বিলীন হতে চলেছে মধুমতি তীরবর্তী নড়াইলের ঘাঘা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়। ইতিমধ্যে বিদ্যালয়ের নীচে কয়েকফুট নদী ঢুকে যাওয়ায় চরম ভাঙ্গনের মুখে বিদ্যালয়টি। কার্যাদেশের তিন মাস পর নদীতীর রক্ষা বাধের কাজ শুরু করায় চলতি বর্ষায় ভেঙে যাবে স্কুলটি, একটি রুম বন্ধ করে ভাঙন আতঙ্কের মুখেই চলছে ক্লাস।

কয়েক বছর ধরে ভাঙ্গনের মুখে মধুমতি পাড়ের নড়াইলের ঘাঘা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। সম্প্রতি ৩ মাস আগে স্কুলের ভিতরে নদী ঢুকে যাওয়ায় প্রাথমিক শিক্ষা কর্তৃপক্ষ স্কুলের নদীর মধ্যে হেলে পড়া একটি রুম বন্ধ করে দিয়েছে। এই অবস্থায় ৩ রুমের বিদ্যালয়টির অন্য একটি রুমে একাসাথে চলছে ৩য় আর ৫ম শ্রেণীর ক্লাস, শিশু শ্রেনী চলছে ডেবে যাওয়া বারান্দায়। ইতিমধ্যে এই স্কুলের অর্ধেক শিশু শিক্ষার্থী ভয়ে স্কুল ছেড়ে দিয়েছে। পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আখি মনি জানায়,আমাদের ক্লাসটি নদীর মধ্যে চলে যাওয়ায় আমরা অন্যরুমে ক্লাস করছি। কখন আমাদের পুরো স্কুলটি নদীর মধ্যে চলে যায় সেই ভয়ে ক্লাস করি। সমাপনী পরীক্ষার জন্য স্কুলে আসি।

৪র্থ শ্রেণীর সাথি খানম,আজমির,রেহান জানায়, স্কুলটি ভেঙে যাবার ভয়ে অনেকেই এখন স্কুলে আসে না, বাড়ি থেকে স্কুলে আসতে মানা করে,আমরা সবসময়ই ভাবি কখন জানি স্কুলটি নদীতে টেনে নিয়ে যায়। আমাদের পড়া লেখার খুব ক্ষতি হচ্ছে। শিশুদের জীবন ঝুকিতে ফেলে কেন ক্লাস নিচ্ছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে সহকারী শিক্ষক সমীর মল্লিক বলেন, আমাদের বিকল্প কোন ব্যবস্থা নাই,এটিই কয়েক গ্রামের একমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ করে দিলে আমরা পাঠদানে পিছিয়ে পড়বো।

প্রধান শিক্ষক নাসরিন পারভীন জানান, স্কুলটি নদীর মাইলখানেক দুরেই ছিলো। গতবছরের ভাঙ্গনের পর স্কুলের একাংশ ৩ ফুট নদীতে ঢুকে যাওয়ায় একটি ক্লাস দেবে গেছে, ঐ ক্লাসটি বন্ধ করে অন্য দুটি রুমে সবগুলো ক্লাস নিতে হচ্ছে। ৪০ বছর ধরে ভাঙ্গন কবলিত মধুমতির তেলকাড়া,করগাতী,ধলইতলা সহ ১০টি গ্রাম। বছরের পর বছর ধরে কয়েকটি স্কুল,শতশত বাড়ি ও ফসলী জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেলেও ভাঙ্গন রোধে কোন পদক্ষেপ নেয়নি পানি উন্নয়ন বোর্ড। মধুমতি নদীর ভাঙ্গনে প্রায় ২০টি গ্রামে যোগাযোগ ব্যবস্থা একবারে বিচ্ছিন্ন।

৩ বছর ধরে নড়াইলের তেলকাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়টি নদীতে ভেঙে যাওয়ায় তা সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ধানের মাঠের মধ্যে হাঁটু পানিতে বর্ষায় স্কুলে আসতে পারে না শিক্ষার্থীরা। সাড়ে ৩শ ছাত্রছাত্রী থেকে কমে এখন দেড়’শ, শিক্ষকদের ইচ্ছে মতো উপস্থিতিতে কোনদিন একটি আবার দুটি ক্লাস হয় এই স্কুলে। টি করগাতী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণীর ছাত্র আব্দুল্লাহ বলেন, আমাদের স্কুলটি ভেঙে যাওয়ায় এখন এ মাঠের মধ্যে আমরা স্কুল করেছি। এখানে বৃষ্টি হলেই পানি জমে। পুরোনো চালের ফুটো দিয়ে পানি পড়ে,নিচে মাটি নেই, নীচ দিয়ে পানি ঢোকে। এর মধ্যে কোনদিন আসি আবার আসি না।

স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার ও নড়াইলের তেলকাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য বায়েজিদ বিল্লাহ বলেন, ৪৮ বছর যাবৎ আমাদের এই এলাকা ভাঙছে অথচ পানি উন্নয়ন বোর্ড কি সরকারী কোন মহল কেউ কোনো দিন খোজ নিতে আসেনি। সম্প্রতি নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য মাশরাফি নদী ভাঙন কবলিত এইসব এলাকা পরিদশর্ন করেন এবং ভাঙ্গন কবলিত স্কুল রক্ষায় কাজের গতি বাড়ানোর তাগিদ দেন। অথচ সংসদ সদস্যের তাগিদ সত্বেও পানি উন্নয়ন বোর্ড আর ঠিকাদারের গাফিলতিতে মধুমতির ভাঙন থেকে এবারো বাচানো যাবে না আরেকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে খুলনা জেলার ভুতিয়ার বিল ও বর্নাল-সলিমপুর কোলাবাসুখালী বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিস্কাশন ও পুনর্বাসন প্রকল্প (২য় পর্যায়) আওতাভুক্ত ঘাঘা পয়েন্টে ৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ২শ ১০ মিটার এবং ৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ২শ মিটার এলাকা স্থায়ী নদীতীর সংরক্ষণ কাজ শুরু হয়। কার্যাদেশ অনুযায়ী ২০১৮ সালের ৬ ডিসেম্বর শুরু হয়ে চলতি বছরের ৩০ জুন কাজ দুটি শেষ হবার কথা। এই কাজে ৫৫ হাজার জিও ব্যাগ এবং একলক্ষাধিক বস্নক ফেলার কথা থাকলেও জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু হয়েছে ১ এপ্রিল। ৩ মাস পরে কাজ শুরু করার কারণে চলতি বর্ষা মওসুমে কাজ শেষ হবে না,ফলে ভাঙন রক্ষায় এই বাধ কোন কাজে আসছে না।

এই দুটি কাজে কুমিল্লার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মশিউর রহমান চৌধুরীর লাইসেন্স নিয়ে কাজ করছেন স্থানীয় ঠিকাদার তারিক হাসান। তিনি বলেন, কাজ শুরু করার পরে পাউবো কর্তৃপক্ষ বিনা অযুহাতে আমাদের ১৩ হাজার জিও ব্যগ বাতিল করেছে। চলতি বর্ষা মওসুমে বাধ নির্মাণ শেষ করা সম্ভব হবে না বলেও স্বীকার করেন তিনি। নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো.শাহানেওয়াজ তালুকদার, নড়াইল জেলা অনলাইন মিডিয়া ক্লাবের সভাপতি উজ্জ্বল রায়কে জানান, বাধ নির্মানে সময়ক্ষেপনে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের উপর দায় চাপিয়ে বলেন, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কিছুদিন দেরীতে কাজ শুরু করেছে।

তারা স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী জিও ব্যাগ ব্যবহার না করায় তাদের কয়েক হাজার ব্যাগ বাতিল করা হয়েছে। এ ব্যাপারে তাদের চিঠি ও দেয়া হয়েছে। তারা ঠিকমতো কাজ না করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।






সংযুক্তিমূলক সংবাদ ..

  • ঝিকরগাছা খাদ্য বিভাগ কর্তৃক কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান ক্রয় শুরু
  • নড়াইলে কবর থেকে কলেজ ছাত্রের লাশ উত্তোলন ও গুল খেয়ে একজনের মৃত্যু
  • নড়াইলে দুুর্নীতি বিরোধী মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখছেন এসপি জসিম উদ্দিন
  • নড়াইলে ছেলেধরা, মাদক ও ইভটিজিং বিরোধী স্টুডেন্ট কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের সমাবেশ অনুষ্ঠিত
  • গুজব ছড়িয়ে যারা ফায়দা লুটতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নিবে প্রশাসন -নওগাঁয় খাদ্যমন্ত্রী
  • তামাকমুক্ত হসপিটালিটি সেক্টর কৌশলপত্র বাস্তবায়নে লিখিত নির্দেশনা প্রদান করবে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড
  • কুড়িগ্রামে আনসার-ভিডিপি উদ্দ্যোগে বন্যার্তদের মাঝে ঈদ উপলক্ষে বস্ত্র বিতরণ
  • নড়াইলে পুলিশের সাপ্তাহিক মাস্টার প্যারেডে সালাম গ্রহণ ও পরিদর্শন করলেন -পুলিশ সুপার
  • Leave a Reply