শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য নিষিদ্ধ

সরকারি নীতিমালার বাইরে শিক্ষকদের সব ধরনের কোচিং বাণিজ্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। পাশাপাশি ২০১২ সালে সরকারের জারি করা এ-সংক্রান্ত নীতিমালা বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ বৃহস্পতিবার পৃথক রিটের শুনানি নিয়ে এ রায় দেন। এর ফলে নীতিমালার বাইরে গিয়ে এখন কোনো শিক্ষক কোচিং করাতে পারবেন না।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, সরকার তার জনগণের কল্যাণের জন্য যে কোনো সময় যে কোনো ধরনের নীতিমালা, নির্দেশিকা ও পরিপত্র জারি করতে পারে। রায়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কার্যপ্রক্রিয়া নিয়ে আদালত বলেন, দুদককে সরকারি প্রতিষ্ঠান আদালত প্রাঙ্গণ, ভূমি, কাস্টমসহ যেসব প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের দুর্নীতি হচ্ছে; অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেখানে অনুসন্ধান ও তদন্ত করা উচিত। কারণ, এসব খাতে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা ক্লাসে উপস্থিত আছে কি নেই, এ ধরনের কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নজর দিলে বড় দুর্নীতির বিষয়গুলো হারিয়ে যাবে। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠানে নজরদারিতে তাদের আইনগত কোনো বাধা নেই। দণ্ডবিধির ১৬৬ ধারা অনুযায়ী নজরদারি করার এখতিয়ার দুদকের রয়েছে। তবে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নজরদারির বিষয় আইন অনুমোদন করে না। তা ছাড়া দুদকেরও পর্যাপ্ত জনবল সংকট রয়েছে।

আদালত বলেন, ‘দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত বড় বড় রাঘববোয়ালকে ধরে এনে ছেড়ে দিয়ে শুধু দুর্বলদের নিয়ে দুদক ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। যেখানে ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়ে যাচ্ছে, সেখানে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকরা স্কুলে যাচ্ছেন কি যাচ্ছেন না, তা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন তারা।’

আদালতে দুদকের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী খুরশীদ আলম খান ও রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোখলেছুর রহমান। অন্যদিকে রিটকারীদের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর ও মো. নাসিরুদ্দিন। মামলায় অ্যামিকাস কিউরি ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ফিদা এম কামাল।

রায়ের পর মোখলেছুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, হাইকোর্টের রায়ের ফলে সরকারি-বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা-২০১২’ কার্যকর হবে। এতে শিক্ষকদের শিক্ষার্থী পড়িয়ে অর্থ আয়ের পথ সীমিত হবে। এ ছাড়া সরকারের এই নীতিমালা সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের জন্যই প্রযোজ্য হবে।

মামলার বিবরণে জানা যায়, কোচিং বাণিজ্যের অভিযোগে মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না- সে জন্য গত বছর কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দুদকের এক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ওই নোটিশ দেওয়া হয়। পরে নোটিশ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধের নীতিমালা-২০১২ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে পৃথক রিট করেন সংশ্নিষ্ট শিক্ষকরা। ওই রিটের শুনানি নিয়ে গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টে নোটিশের কার্যকারিতা চার মাসের জন্য স্থগিতের পাশাপাশি রুলও জারি করেন। এরপর ওই আদেশের বিরুদ্ধে দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করে। তখন আপিল বিভাগ বিচারপতি শেখ হাসান আরিফের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চকে রুল নিষ্পত্তি করতে নির্দেশ দেন। এরই ধারাবাহিকতায় রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে গতকাল রায় দেন হাইকোর্ট।

২০১২ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা নীতিমালায় বলা হয়, কোনো শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে পারবেন না। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের অনুমতি নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ জন শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে ছাত্রছাত্রীর তালিকা, রোল, নাম ও শ্রেণি উল্লেখ করে জানাতে হবে। নীতিমালায় আরও রয়েছে, অভিভাবকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত সময়ের আগে বা পরে অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে মহনগরী এলাকার প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মাসে ৩০০ টাকা, জেলা পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ২০০ এবং উপজেলা ও অন্যান্য এলাকার শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ১৫০ টাকা নেওয়া যাবে। তবে প্রতিষ্ঠানের প্রধান ইচ্ছা করলে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের এই অতিরিক্ত কোচিংয়ের টাকা কমাতে বা মওকুফ করতে পারবেন। এ ছাড়া নীতিমালা অনুযায়ী অতিরিক্ত ক্লাসের ক্ষেত্রে একটি বিষয়ে মাসে কমপক্ষে ১২টি ক্লাস নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রতি ক্লাসে সর্বোচ্চ ৪০ জন শিক্ষার্থী অংশ নিতে পারবে। নীতিমালায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিকেও কোচিং বাণিজ্য রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে কোচিং বাণিজ্য বন্ধে মনিটরিং কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নীতিমালা না মানলে শিক্ষকের এমপিও স্থগিত, বাতিল, বেতন-ভাতা স্থগিত, বেতনের ধাপ অবনমিতকরণ, সাময়িক বা চূড়ান্ত বরখাস্ত অথবা নন-এমপিও শিক্ষকদের ক্ষেত্রে বেতন-ভাতা স্থগিত, বেতনের ধাপ অবনমিতকরণ, সাময়িক বা চূড়ান্ত বরখাস্তেরও বিধান রাখা হয়েছে। আর নীতিমালা ভঙ্গকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থা না নিলে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়াসহ সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অধিভুক্তি বাতিলের কথা বলা হয়েছে।



(পরবর্তী র্সবাদ ...) »



সংযুক্তিমূলক সংবাদ ..

  • সাবেক ওসি মোয়াজ্জেমকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ
  • না’গঞ্জে কিশোরীকে ধর্ষণ : গ্রেফতার-১
  • অস্ত্র মামলায় সাবেক এমপি কাদের খানের যাবজ্জীবন
  • বেনাপোলে ভারতীয় রুপি ও ফেন্সিডিল উদ্ধার
  • সিলেটে র‌্যাব-৯ এর অভিযানে অস্ত্রসহ পেশাদার অস্ত্র ব্যবসায়ী আটক
  • নারায়ণগঞ্জে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের ২ জনকেগ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব
  • মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা যাবে না: হাইকোর্ট
  • আদালতের রায় না মেনে জমি দখল নিয়ে ধান কেটে নিলো মামারা
  • Leave a Reply