জাগ্রত হোক বই কেন্দ্রিক সামাজিকতা

dsc02641

আ এস এম মুকুল :: আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার সর্বোত্তম জায়গা পরিবার। সেখান থেকেই তৈরি হওয়ার কথা বইপড়ুয়া প্রজন্ম।

কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হয় সময়ের সঙ্গে আমরা যেন সাহিত্য, সংস্কৃতি চর্চা থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। আর এই সুযোগে অপসংস্কৃতির ভর আমাদের মননে ভাঙ্গন শুরু করেছে। ফলশ্রুতিতে সমাজে ফুলে-ফেঁপে উঠছেঅস্থিরতা। শূন্যতা, হাহাকার ধ্বংস করতে বসেছে আমাদের সৃজনী-ক্ষমতা আর মানবিক মূল্যবোধকে।আমরা অনেকভাবেই নিজেদের পরিবারের মাঝে বই পড়া, সংগ্রহ করা এবং বই উপহার দেয়ার রীতি চালুকরতে পারি। কিভাবে হবে সেটাই বলছি। সামাজিক কোনো প্রতিক্রিয়ার দিকে না তাকিয়ে আমরা ঘর থেকেই শুরু করবো বই পড়া আন্দোলনটি। প্রথমে পরিবারের সদস্যদের বিয়ে, জন্মদিন, বিশেষ সাফল্য অর্জন, বিদেশযাত্রা, বিশেষ দিবসে অন্য গিফটের পরিবর্তে বই কিনে দিতে পারি। সামাজিক কারণে আমরা বিয়ে বা জন্মদিনে দাওয়াতে বিশেষ কিছু উপহার দিয়ে থাকি।

আমরা যদি এসবক্ষেত্রে বই উপহারকে বেছে নিই তাহলে অনেক ধরণের অনেকগুলো বই উপহার দেয়া যায়।
সমাজে এই প্রচলন ছড়িয়ে দিলে সারাদেশব্যাপী বই পড়া আন্দোলন জোড়দার হবে এতে সন্দেহ নেই। ঘড়ে ঘরে প্রতিষ্ঠিত হবে পারিবারিক পাঠাগার। আর এর মাধ্যমে মেধায়, মননে ও সৃজনশীলতায় আমাদের প্রজন্ম গড়ে উঠবে পরিশীলিত ও মানবীয় গুণে। আমরা যত বই পড়বো, মনের চক্ষু ততই খুলবে। আজকের দিনের অস্থির সমাজের অহমিকার ব্যারিকেড ভেঙ্গে দিতে পারে বইপড়া আন্দোলন। আপনার সন্তানকে মোবাইল, ইন্টারনেট আর ফেসবুকের নেশা কাটিয়ে দিতে পারে বইয়ের নেশা। কিন্তু সে নেশাটি ধরাতে হবে অভিভাবকদের প্রাণান্তকর চেষ্টায়। সন্তানদেরকে মাদক আর জঙ্গীবাদ এমনসব বিপথগামিতার হাত থেকে রক্ষা করতে পারে বই পড়া।

তবুও এ কথা সত্য যে স্বাধীনতা অর্জনের ৪৬ বছরে এসব জরাজীর্ণতার মধ্য দিয়েই তৈরি হয়েছে লাখো
লাখো তরুণ পাঠক। বইয়ের মাধ্যমে বোধ পরিবর্তনের এ আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছে আমাদের বাংলা একাডেমি; লেখক, প্রকাশক সর্বোপরি প্রাণের প্রিয় এ বইমেলা। বইমেলার মধ্য দিয়ে বই কেনা, উপহার দেয়া এবং বই পড়ার অভ্যাস বাড়ে। এ ধারাবাহিকতা আমাদের এগিয়ে নিচ্ছে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

তবে পাঠক ধরে রাখা এবং নতুন পাঠক সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রকাশক, লেখক ও বাংলা একাডেমিকে নতুন যুগোপযোগী উদ্যোগ নিতে হবে। ছোটবেলায় আমরা বই চুরি করে নিয়ে পড়তাম। বই বদল করে পড়তাম। বই উপহার পেতাম এবং দিতাম। এখন কেন জানি এই অভ্যাসে ভাটা পড়েছে। এটি খুবই ভয়ানক ব্যাপার। বিয়ে, জন্মদিন, সাংস্কৃতিক উৎসবে এখন আর বই উপহার দিতে দেখা যায় না। আজকালকার বিয়ের অনুষ্ঠানে এক হাজার টাকার নিচে কিছু উপহার দেয়া যায় না। অথচ এক হাজার টাকায় ৫/৭টি বই উপহার দেয়া সম্ভব। ধরা যাক একটি বিয়েতে আপ্যায়িত হয়ে থাকেন ২০০ থেকে ৩০০ জন। এদের মধ্যে ৫০ জন যদি এক হাজার টাকার বই দেন তাহলে ৫০ হাজার টাকার বই উপহারে সেই পরিবারটিতে একটি পাঠাগার তৈরি হতে পারত।

আমাদের সমাজে অদ্ভুত আরেকটি রীতি দুঃখজনকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে- এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক ও
ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এমনকি শিল্প বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক বনভোজনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় পুরষ্কার হিসেবে এখন বই উপহারের বদলে গৃহসামগ্রী দেয়া হয়। অথচ এসব আয়োজনে বইকে প্রাধান্য দিলে এই সিজনে কোটি কোটি
টাকার বই বিক্রি হতে পারত।আমাদের সমাজের একটি পরিবারের বইমেলায় বই কেনার জন্য ২ হাজার টাকাও বাজেট থাকেনা। দেখা গেছে শিশুরা বই কিনতে চাইলেও মা-বাবার অনাগ্রহের কারণে তাদের বইয়ের চাহিদা মিটছেনা।

অথচ এই বাবা মায়েরাই একদিন একবেলা পেটপুড়ে চায়নিজ খেয়ে ২/৩ হাজার অবলীলায় শেষ করেও যে আনন্দ প্রকাশ করেন সন্তানকে সেই পরিমাণ টাকার বই কিনে দিয়েও গর্বিত হতে দেখা যায়না। দুঃখের বিষয়
হলো- এমন বাবা মায়েরাই আবার মননশীল সুসন্তান হিসেবে নিজের সন্তানকে দেখতে চান! আমাদের এই দৃষ্টিভঙ্গী বদলাতে হবে। বইমেলায় বছরে একবার পরিবার প্রতি যদি ২ হাজার টাকার বই কেনার বাজেট থাকে তাতেও অনেক বই বিক্রি হওয়ার কথা। ভেবে দেখুন, আমাদের পিএসসি, জেএসসি পরীক্ষার্থীও সংখ্যা কত কোটি। আমাদের সরকারি বেসরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সৃজনশীল বই কিনে পাঠাগার স্থাপন করা বাধ্যতামূলক হলে শত কোটি টাকার বই বিক্রি হওয়ার কথা।

আশ্চর্য লাগে এসব বিষয় নিয়ে প্রকাশনা সংস্থাগুলোর তৎপরতা লক্ষ্য করা যায় না। গৎবাঁধা বক্তৃতা না করে বই শিল্পের বিকাশে উদ্ভাবনীমূলক কার্যক্রম তৎপরতা বাড়াতে হবে। বই শিল্প বিকাশে সরকারের বড় ধরণের পৃষ্ঠপোষকতা অতি আবশ্যক। প্রকাশনাকে শুধু একটি নান্দনিক মেধা বিকাশক শিল্পই নয় জাতি গঠনে এবং সৃজনশীল সংস্কৃতির সম্প্রীতি ঘটাতে এ শিল্পের ভূমিকা অগ্রগণ্য। এমন একটি শিল্পের প্রতি সরকার উদাসীনতা হবেন না এটাই জাতির প্রত্যাশা। সৃজনশীল প্রকাশনার প্রথম ক্রেতা হতে হবে সরকারকে। সরকার ক্রেতা হয়ে বই পঠনকে জনপ্রিয় করে তুললে প্রজন্মের মাঝে সৃষ্টিশীল নেতৃত্ব তৈরি হবে। সামাজিক অসঙ্গতি ও সংঘাত কমবে। এ কাজে সরকারেরই লাভ বেশি।

সরকার তার পাঁচ বছর ক্ষমতার মেয়াদে ২০ কোটি করে ১০০ কোটি টাকার বই কিনলে পাল্টে যাবে প্রকাশনা শিল্পের অবয়ব। লেখক, পাঠক তৈরি হবে। এগিয়ে যাবে দেশ এবং জাতি। তবে সরকারের ক্রয়নীতিতে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করতে হবে। তা না হলে প্রকাশনার মান ধরে রাখা সম্ভব হবে না। সরকার পৃষ্ঠপোষক হলে দ্রুততম সময়ে বিকশিত হবে এই সম্ভাবনাময় শিল্পটি। প্রতিষ্ঠিত হবেন লেখক এবং বাড়বে বইয়ের বাজার। আমরা একটি সৃজন ও মননশীল প্রজন্ম গড়তে পারবো।

এস এম মুকুল, লেখক ও কলামিস্ট,






সঙ্গতিপূর্ণ আরো খবর

  • কবি সাযযাদ কাদির আর নেই
  • সিরাজগঞ্জে ৪০০ একর জমির উপর শিল্প পার্কের নির্মানযজ্ঞ শুরু চলতি মাসেই
  • পাখি প্রেমীক দু’বন্ধু’রুয়েটের দুই মেধাবী বন্ধু প্রাণীজগতকে ক্যামেরায় বন্দির অদ্ভুত কাণ্ডকীর্তির রহস্য’
  • সাতক্ষীরা সরকারি কলেজে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সপ্তাহের সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণ
  • কবিতা আবৃত্তিতে জেলায় শ্রেষ্ঠ শান্তা খাতুন
  • জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ সাতক্ষীরা শাখার সম্মেলন অনুষ্ঠিত
  • মহান ভাষা শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে জেলা শিল্পকলা একাডেমীতে চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা