ক্ষমতায় গেলে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে খালেদার নতুন কর্ম পরিকল্পনা

176457_1
Share Button

সাতক্ষীরা নিউজ ডেস্ক :: হত্যা-গুম, অপহরণ, নিখোঁজ, খুন, ধর্ষণ ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা রোজ উঠে আসছে গণমাধ্যমে। মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা দেশি-বিদেশি সংগঠনগুলো এসব নিয়ে তাদের উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। তাদের বক্তব্য, বিবৃতি ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই উদ্বেগ। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো উন্নতি নেই।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় মানবাধিকার সমস্যা বর্তমানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য, কর্মক্ষেত্রে সঠিক পরিবেশের অভাব ও শ্রমিক অধিকারের দুর্বল অবস্থা। বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, খুন, গুম ও অপহরণের ঘটনাও চলছে। নিয়ম না মেনে গ্রেপ্তার, নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ, সভা-সমাবেশ ও বাক-স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সরকারের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি ও সরকারের হয়রানির ভয়ে একাধিক সাংবাদিকের সমালোচনার পথ পরিহার করে আত্মনিষেধাজ্ঞার পথ বেছে নেওয়া, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সহিংসতা, দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনাও বন্ধ হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহনশীলতার অভাবে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ অস্তিত্বহীন।তাই এমন পরিবেশে মানবাধিকার ভুলুণ্ঠিত।

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে দেশীয় সংস্থার সাথে সুর মিলিয়ে প্রায় অভিন্ন অভিমত দিচ্ছে মানবাধিকার বিষয়ক একাধিক আন্তর্জাতিক সংগঠন। যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০১৬ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতি সংক্রান্ত বৈশ্বিক রিপোর্টে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়। কিন্তু সরকারের পক্ষে এসব অস্বীকার করা হয়। বরং সরকার দলীয় মন্ত্রী-এমপি ও নেতানেত্রীদের পক্ষে দাবি করা হয়-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি অনেক ভালো। তারা বক্তব্য-বিবৃতিতে বলেন, আমাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রকে বলবো, আমাদের বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণ করার আগে নিজেদের বিষয়ে দয়া করে আগে বিশ্লেষণ করুন। সবমিলেই দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।

এই পরিস্থিতি দেশের সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, বুদ্ধিজীবী ও সব শ্রেণীর পেশাজীবীদেরকেও ভাবিয়ে তুলেছে। এক্ষেত্রে বিরোধী রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের উদ্বেগও কম নেই।

সম্প্রতি দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে একটি উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে একটি দীর্ঘমেয়াদী মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন।

গত ১০ মে সাংবাদিক সম্মেলনে ‘ভিশন ২০৩০’ নামে মহাপরিকল্পনায় তিনি এই পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।

বেগম জিয়া তার ভাষণে দেশের মানবাধিকার ও জননিরাপত্তার পরিস্থিতির ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, বাংলাদেশ আজ নিরাপত্তাহীন ঝুঁকিপূর্ণ এক জনপদে পরিণত হয়েছে। মাতৃগর্ভের শিশুও নিষ্ঠুর অপরাধের থাবা থেকে মুক্ত নয়। বিচারালয় আজ বিরোধী মতের নেতা-কর্মীদের দমনে ব্যবহৃত হওয়ার ফলে বিচার প্রার্থীরা আদালতের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দেশে আশঙ্কাজনকভাবে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সুবিচার নিশ্চিত করতে হবে। সে লক্ষ্যে জনপ্রশাসন, বিচার, পুলিশ ও কারাগার এ চার প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানকে স্বচ্ছ, দক্ষ, আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা হবে।

তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেন,বিএনপি মানবিক মূল্যবোধ ও মানুষের মর্যাদায় বিশ্বাসী; আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ। অবশ্যই আইনের শাসনের নামে কোন প্রকার কালা-কানুনের শাসন গ্রহণযোগ্য হবে না। বিএনপি সকল প্রকার কালা-কানুন বাতিল করবে। সকল প্রকার নিষ্ঠুর আচরণ থেকে মানুষকে মুক্ত রাখার লক্ষ্যে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড, গুম, খুন এবং অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অবসান ঘটাবে বিএনপি।

তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ বাতিল করা হবে এবং মানবাধিকার সম্পর্কিত জাতিসংঘের সর্বজনীন ঘোষণা বাস্তবায়ন করা হবে।

বেগম খালেদা জিয়া বলেন, এটা সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃত যে বর্তমানে বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নেই। সর্বোচ্চ থেকে সর্বনিম্নআদালতের বিচারক নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন এবং কর্ম নির্ধারণের একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হবে মেধা। দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, নীতিবোধ, দেশপ্রেম, বিচার-বোধ ও সুনামের কঠোর মানদন্ডে যাচাই করে উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগ করা হবে। যোগ্যতা, মেধা ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংবিধানের আলোকে বিচারপতি নিয়োগের জন্য সুনির্দিষ্ট যোগ্যতা ও মানদন্ড সম্বলিত আইন প্রণয়ন করে বাছাই কমিটি ও সুপ্রীম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগের ব্যবস্থা করা হবে। নিয়োগের জন্য বাছাইকৃত/সুপারিশকৃত ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত তথ্য ও সম্পদ বিবরণী জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।

‘বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করে জনগণের জন্য ন্যায় বিচার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা হবে। অধস্তন আদালতকে নির্বাহী বিভাগের আওতামুক্ত করার লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের অধীনে পৃথক সচিবালয় স্থাপন করা হবে।’

বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও বিচারপ্রার্থীদের নিকট দায়বদ্ধ করার জন্য সমস্ত বিচার প্রশাসন ও বিচার প্রক্রিয়াকে পরিপূর্ণভাবে ইলেকট্রনিক/অন-লাইন ব্যবস্থাপনায় রূপান্তর করা হবে। আদালতের উন্মুক্ত তথ্য বিচার প্রার্থীরা ইলেকট্রনিক পদ্ধতি/অন-লাইন ও মোবাইল ফোন টেকনোলজীর মাধ্যমে জানতে পারবে।

বিচার প্রক্রিয়ার জটিলতার বিষয়ের ওপর দৃষ্টি জনগণের আকর্ষণ করে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেন, প্রয়োজনীয় সংখ্যক যোগ্য বিচারক নিয়োগের মাধ্যমে মামলার জট কমিয়ে আনা হবে। নিম্ন আদালতে বিচার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, দ্রুত ও গ্রহণযোগ্য করার লক্ষ্যে সমাজে বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকা সম্মানীয়, নীতিবান ও আদর্শ মানুষদের দিয়ে পাইলট ভিত্তিতে ‘জুরি’ ব্যবস্থার পুনঃ প্রবর্তন করা হবে।

‘আদালতে মামলার বোঝা কমানো এবং স্থানীয় বিচার ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি উৎসাহিত করার লক্ষ্যে গ্রাম-আদালতকে উপযুক্ত সংস্কারের মাধ্যমে কার্যকর আদালত হিসাবে রূপান্তর করা হবে। বর্তমানে বিদ্যমান ইউনিয়ন কাউন্সিল ব্যবস্থায় গ্রাম-আদালতের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী অনানুষ্ঠানিক সালিশী আদালত পুনঃপ্রবর্তন করা যায় কিনা পরীক্ষা করে দেখা হবে।’

বেগম খালেদা জিয়া আরো বলেন, বর্তমান বিচারব্যবস্থার সংস্কারের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের জুডিশিয়াল কমিশন গঠন করা হবে।

‘বর্তমানে থানায় গেলে পুলিশ মামলা নেয় না। এটা ডিনায়েল অব জাস্টিস। এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য দেশব্যাপী থানাগুলোতে অন-লাইন পদ্ধতি ও মোবাইল টেকনোলজি ব্যবহারের মাধ্যমে অভিযোগ দায়েরের সুযোগ সৃষ্টি করে ফৌজদারী বিচার প্রার্থীদের আইনের নিরাপত্তা পাওয়ার সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হবে।’

জনগণের প্রতি পুলিশের নিষ্ঠুর আচারণ প্রসঙ্গে খালেদা জিয়া বলেন, পুলিশ বাহিনীকে একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক সমাজের উপযোগী করে গড়ে তোলা হবে। জনগণের সেবক হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে পুলিশের মোটিভেশন, ট্রেইনিং ও নৈতিক উন্নয়নের কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। সিআরপিসি, পিআরবি, পুলিশ আইন এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি অনুযায়ী পুলিশের উপর বিচার বিভাগীয় তদারকি (Judicial Oversight)নিশ্চিত করে জবাবদিহি ও কল্যাণমূলক জনপ্রশাসন গড়ে তোলা হবে।

‘দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব ও প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সঙ্গতি রেখে পুলিশ বাহিনীকে দক্ষতাসম্পন্ন যুগোপযোগী সুসজ্জিত বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা হবে। জনগণের জান-মাল ও সম্ভ্রম রক্ষা এবং সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নিরপেক্ষভাবে পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করার জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দলীয় প্রভাবমুক্ত একটি চৌকষ, দক্ষ, নিরপেক্ষ, জনকল্যাণমুখী বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা হবে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর উপর অনাকাঙ্খিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা হবে।’

‘দেশবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পুলিশ ও জনপ্রশাসনে ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচি হাতে নেয়া হবে। বাংলাদেশে বর্তমানে যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য পদে নিয়োগ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যক্তিগত বিশ্বাস-অবিশ্বাস ও দলীয় আনুগত্যের সংকীর্নতা মুক্ত থেকে মেধা, সততা, দক্ষতা, যোগ্যতা, দেশপ্রেম, নীতিবোধ ও বিচারক্ষমতার উপর নির্ভর করে জনপ্রশাসনকে পুনর্বিন্যাস করা হবে।’

বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া এও বলেন, একটি দক্ষ, স্বচ্ছ, গতিশীল, মেধাবী, জবাবদিহিমূলক যুগোপযোগী ও গণমুখী জনপ্রশাসন গড়ে তোলা হবে। মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যথাযথ সংস্কার করা হবে। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, নারী ও প্রান্তিক নৃ-গোষ্ঠী কোটা ব্যতিরেকে কোটা পদ্ধতি বাতিল করা হবে। গতিশীল বিশ্বায়নের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সংবিধানের আলোকে একটি যথোপযুক্ত সিভিল সার্ভিস আইন প্রণয়ন করা হবে। সকল পর্যায়ে ই-গভার্ন্যান্স চালু করা হবে। জনপ্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশে বিদেশে উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।






সঙ্গতিপূর্ণ আরো খবর

  • মওলানা ভাসানীর ৪১তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ
  • তুরাগ তীরে জোড় ইজতেমা শুরু
  • দেশে আরো নতুন দুটি চামড়া শিল্প হবে : প্রধানমন্ত্রী
  • সমুদ্র বন্দর সমূহে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত
  • রোহিঙ্গা ইস্যুতে সঙ্কটের মুখে বাংলাদেশ : শেখ হাসিনা
  • রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি
  • ইভিএম ব্যবহারে প্রস্তুত নয় ইসি
  • দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী